হাসনাতের “খেজুরের অংক ক্লাস” ইস্যুতে ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট কাজী শাহ আরেফীনের
খেজুর বিতরণ নিয়ে ইঙ্গিতে বার্তা কাজী শাহ আরেফীনের, আলোচনায় হাসনাত
কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে। রমজান উপলক্ষে খেজুর বিতরণের হিসাব নিয়ে মধ্যরাতে নিজের ফেসবুক থেকে সরাসরি সম্প্রচারে এসে ডিজিটাল বোর্ডে অংক কষে উপস্থাপন করায় বিষয়টি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও কটাক্ষের জন্ম দিয়েছে।
মঙ্গলবার গভীর রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে সরাসরি সম্প্রচারে এসে তিনি সংসদীয় এলাকায় চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ, সরকারি সেবা এবং ত্রাণ বিতরণের হিসাব স্লাইড আকারে তুলে ধরেন। খেজুরের বক্স, কেজি এবং ওয়ার্ডভিত্তিক বণ্টনের হিসাব এমনভাবে ব্যাখ্যা করতে দেখা যায়, যা অনেকের কাছে যেন একটি শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মতো মনে হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এটিকে ব্যঙ্গ করে “খেজুরের অংক ক্লাস” বলেও মন্তব্য করেছেন।
অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসনের একটি সরকারি পত্রে দেখা গেছে, সৌদি আরবভিত্তিক মানবিক সংস্থা কিং সালমান মানবিক সহায়তা ও ত্রাণ কেন্দ্রের উপহার হিসেবে কুমিল্লা জেলায় মোট ৫০০ কার্টন সৌদি খেজুর বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং তা উপজেলা ভিত্তিতে বিতরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সরকারি ওই নথি অনুযায়ী কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলায় বরাদ্দ ছিল— দাউদকান্দি ৩৯ কার্টন, দেবীদ্বার ৩৯ কার্টন, কুমিল্লা সদর ২৪ কার্টন, তিতাস ২৩ কার্টন, মুরাদনগর ৫৫ কার্টন, মেঘনা ২০ কার্টন, বুড়িচং ২১ কার্টন, ব্রাহ্মণপাড়া ২০ কার্টন, আদর্শ সদর ২১ কার্টন, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন ১৮ কার্টন, চৌদ্দগ্রাম ৩৪ কার্টন, বরুড়া ৩১ কার্টন, লাকসাম ২১ কার্টন, মনোহরগঞ্জ ২৮ কার্টন, নাঙ্গলকোট ৪১ কার্টন, লালমাই ২৩ কার্টন এবং হোমনা ৩৪ কার্টন। মোট বরাদ্দ ছিল ৫০০ কার্টন।
অর্থাৎ সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেবীদ্বার উপজেলায় বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩৯ কার্টন খেজুর, যা আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে।
এদিকে বিষয়টি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হলে কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও বর্তমান সরকারের ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের ছোট ভাই এবং পরিচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিত্ব কাজী শাহ আরেফীন তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে একটি ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা দেন।
বার্তায় তিনি সরাসরি কারও নাম উল্লেখ না করলেও লেখেন, “একজন অতি জ্ঞানী শিক্ষক ডিজিটাল বোর্ডে অংক কষে দেখিয়েছেন কত বক্স খেজুর এসেছে এবং কত কেজি খেজুর বিতরণ হয়েছে। বিষয়টি দেখে কিছুটা বিস্ময় হয়েছে। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো এলাকায় খেজুর পাঠানোর এমন কোনো প্রকল্প আছে বলে আমার জানা নেই।”
তিনি আরও বলেন, সাধারণত রমজান মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ যাকাত ও সদকার অর্থ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের মধ্যে খাদ্য সহায়তা হিসেবে বিতরণ করে থাকে। তাই এ ধরনের বিষয় উপস্থাপনের সময় বাস্তবতা ও তথ্যের সঠিকতা বজায় রাখা জরুরি।
সাংসদ হাসনাত আবদুল্লাহ রাজনীতিতে আসার পর থেকেই একাধিক বিতর্কে জড়িয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে আলোচনায় আসার পর তার বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক মহলে সমালোচনার জন্ম দেয়।
২০২৫ সালে তিনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো নিয়ে কড়া মন্তব্য করে বিতর্কের সৃষ্টি করেন। একই সময়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনার প্রশ্নে ছাত্রনেতা সারজিস আলমের সঙ্গে তার প্রকাশ্য মতবিরোধ সামনে আসে, যা তখনকার রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
এছাড়া নির্বাচনের আগে ত্রাণের অর্থ লেনদেন নিয়ে একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। পরবর্তীতে একটি ভিডিওতে বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগ ওঠার পর তিনি প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশও করেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্লেষক ও কলামিস্টদের কেউ কেউ আবার ২০২৪ সালের বন্যার সময় ত্রাণ তহবিলের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। কলামিস্ট মিজান রহমান তার ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে বন্যার্তদের সহায়তার জন্য প্রায় ১১ কোটি ৬৯ লাখ ৮৪ হাজার ৪২০ টাকা সংগ্রহ করেছিলেন।
তার দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়, মোট সংগ্রহ করা অর্থের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয় এবং বাকি প্রায় ৯ কোটির বেশি টাকা একটি তহবিলে জমা দেওয়া হয়েছে বলে বলা হয়। তবে ওই হিসাব নিয়ে এখনো অনেকের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সবশেষে খেজুর বিতরণ নিয়ে মধ্যরাতে করা এই “ডিজিটাল হিসাব ক্লাস” এখন কুমিল্লার রাজনীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক কৌতুক, সমালোচনা এবং প্রশ্নের খোরাক হয়ে উঠেছে।






















