যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি ঘিরে বিতর্ক: শূকরের মাংস আমদানির আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাক্ষরিত একটি বাণিজ্য চুক্তিকে ঘিরে দেশে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)’ নামে ওই চুক্তির আওতায় কিছু খাদ্যপণ্য আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে, যার মধ্যে শূকরের মাংস ও শূকরজাত পণ্যও থাকতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে।
দেশের বিদ্যমান আমদানিনীতি আদেশ ২০২১–২০২৪ অনুযায়ী ২৬ ধরনের পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ, যার মধ্যে শূকর ও শূকরজাত সব পণ্য অন্তর্ভুক্ত। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শূকরের মাংস থেকে উৎপন্ন উপজাত ব্যবহার করে তৈরি পণ্যও দেশে আমদানি করা নিষিদ্ধ। ফলে এসব পণ্যের বাণিজ্যিক চাহিদা বা উৎপাদন দেশে নেই। ব্যক্তি পর্যায়ে সীমিত উৎপাদন থাকলেও সরকারি কোনো তথ্যভিত্তিক চাহিদা নেই।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে দ্রুততার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআরটি চুক্তি স্বাক্ষর করা হয় বলে আলোচনায় এসেছে।
সমালোচকরা বলছেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের জনগণের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো পণ্য আমদানির সুযোগ তৈরি হলে তা উদ্বেগজনক হতে পারে। বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এ নিয়ে আপত্তিও তোলা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী শুধু শূকরের মাংস নয়, দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও গরু, মুরগি ও ডেইরি পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের মাংস আমদানির ক্ষেত্রেও কিছু শর্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। এছাড়া বৈজ্ঞানিক বা স্বাস্থ্যঝুঁকির সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য ‘স্যানিটারি পরিদর্শনে’ আটকে না দেওয়ার শর্তও আলোচনায় এসেছে।
বাণিজ্য সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের শর্ত কার্যকর হলে দেশে উৎপাদিত পণ্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে এবং নিষিদ্ধ পণ্য নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে অন্য একটি মত হলো, যুক্তরাষ্ট্রে পাল্টা শুল্ক সংক্রান্ত আদালতের রায়ের পর এই চুক্তির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চুক্তি অনুযায়ী ৬০ দিনের নোটিশে এটি বাতিলের সুযোগ রয়েছে বলেও জানা গেছে।
আমদানিনীতি ২০২১–২০২৪-এর পরিশিষ্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে জীবিত শূকর ও শূকরজাত সব পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ। অতীতের নীতিমালাতেও একই বিধান ছিল। তবে চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত চুক্তির একটি পরিশিষ্টে কিছু প্রক্রিয়াজাত মাংসপণ্য—যেমন ব্ল্যাক ফরেস্ট হ্যাম, ব্রাটভুর্স্ট, ক্যাপোকোলা, চোরিজো, কিলবাসা, মরটাডেলা, প্যানসেটা, প্রসিউটো ও সালামি—বাজারে প্রবেশযোগ্য পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার শর্ত উল্লেখ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যেগুলোর অনেকই শূকর থেকে প্রস্তুত।
বাংলাদেশে শূকরের মাংস উৎপাদন কার্যত নেই। হোটেল-রেস্তোরাঁয়ও এর ব্যবহার সীমিত। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কিছু সীমান্ত এলাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সীমিত পরিসরে শূকর পালন দেখা যায়, যা মূলত নিজস্ব ভোগের জন্য।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির এক কর্মকর্তা জানান, দেশে শূকরের মাংসের বাণিজ্যিক চাহিদা নেই। ঢাকার কিছু নির্দিষ্ট স্থানে সীমিত পরিসরে এ ধরনের মাংস ব্যবহৃত হয়, যা মূলত নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয়। ফলে আমদানির প্রয়োজনীয়তা খুবই সীমিত।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে শূকরের মাংস রপ্তানি হয় না এবং এ খাতে কোনো বৈধ রপ্তানি ব্যবস্থা নেই। অতীতে অবৈধভাবে শূকরজাত উপাদান আমদানির ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নজিরও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্র শূকরের মাংস রপ্তানিতে শীর্ষ দেশগুলোর একটি। মার্কিন কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি সময়ে দেশটি প্রায় ৪ লাখ ৯৩ হাজার টন শূকরের মাংস রপ্তানি করেছে, যার মূল্য প্রায় ১.৩৭ বিলিয়ন ডলার।
চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের এক নেতা বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো নীতি গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মীয় সংগঠনের এক নেতাও চুক্তির বিষয়টি স্বচ্ছভাবে প্রকাশ না করায় সমালোচনা করেন এবং পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশে শূকরের মাংস নিষিদ্ধ ছিল এবং তা বহাল থাকবে। নতুন আমদানিনীতি প্রণয়নেও এই নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এছাড়া দেশে পর্যাপ্ত গরু ও মুরগির মাংস উৎপাদন হওয়ায় সাধারণভাবে মাংস আমদানির অনুমোদন নেই। অতীতে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে মাংস রপ্তানির চেষ্টা করলেও তা অনুমোদন পায়নি। তবুও চুক্তির নির্দিষ্ট কিছু ধারায় এসব পণ্য আমদানির বিষয়ে শর্ত অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
চুক্তির একটি ধারায় যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিদর্শন ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মাংস, পোলট্রি ও ডিমজাত পণ্য আমদানির পথ সুগম হতে পারে।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বারবার বলা হয়েছিল যে বিদেশ থেকে শূকুরের মাংস আমদানির কোনো পরিকল্পনা নেই। এ বিষয়ে পূর্বে সরকারি বিবৃতিতেও এমন অবস্থান তুলে ধরা হয়েছিল।

আজকের কথা ডেস্ক