হামের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশের সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে এক ভয়াবহ সংকটের রূপ নিয়েছে। সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে চরম অদক্ষতা ও উদাসীনতার অভিযোগ উঠেছে সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে। এর ফলে দেশজুড়ে এখন পর্যন্ত ২৯৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত।
একসময় নিয়মিত টিকাদানের ফলে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু চলতি বছর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬১ জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫ হাজার ছাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনার কারণেই এ সংকট তৈরি হয়েছে। একসময় দরিদ্র দেশগুলোর জন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি মাত্র ১৮ মাসের ব্যবধানে কার্যত ভেঙে পড়ে।
টিকা সংকটের পেছনের কারণ
টিকা কেনার পদ্ধতি ও অর্থায়নের উৎস পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ায় পুরো প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। ফলে টিকার ঘাটতি দেখা দেয় এবং একপর্যায়ে মজুত একেবারে তলানিতে নেমে আসে। এর ধারাবাহিকতায় শুরু হয় হামের প্রাদুর্ভাব।
এর সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলন ও কয়েক দফা কর্মবিরতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, বারবার সতর্ক করা হলেও অন্তর্বর্তী সরকার তাদের পুরো মেয়াদে কোনো বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেনি। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে একটি বিশেষ কর্মসূচি চালানোর কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
🌍 আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এমআর-১ ও এমআর-২ টিকার মজুত ফুরিয়ে যাওয়া, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি এবং ২০২০ সালের পর থেকে সম্পূরক ক্যাম্পেইন না হওয়াই এই সংকটের মূল কারণ।
🏥 স্বাস্থ্যখাতের কাঠামোগত ভাঙন
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি)-এর চতুর্থ ধাপ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়। পরবর্তী ধাপ চালুর পরিবর্তে ২০২৫ সালের মার্চে পুরো কর্মসূচি বাতিল করা হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, টিকাদানসহ সব কার্যক্রম সরাসরি সরকারের নিয়মিত কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তবে বাস্তবে এই পরিবর্তন কার্যকর করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
ব্রিজিং প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে দেরি এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার জটিলতায় স্বাস্থ্যসেবা স্থবির হয়ে পড়ে।
🚨 প্রভাব: শুধু টিকা নয়, পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা
১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ কমে যায়
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনসিডি কর্নারে ওষুধ সংকট দেখা দেয়
অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ হয়ে যায় অনেক স্থানে
কৃমিনাশক ট্যাবলেট ও ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন এক বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারণ মিলেই হামের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে।
“বহু পরীক্ষিত একটি কর্মসূচি হঠাৎ করে বন্ধ করা উচিত হয়নি। এক্সিট প্ল্যান সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না।”
“অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হওয়ায় জনবলের বড় শূন্যতা তৈরি হয়। এতে পুরো ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ে।”
💸 টিকা কেনায় জটিলতা
২০২৫ সালের আগস্টে ৮৪২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও টিকা কেনার নতুন পদ্ধতিতে জটিলতা তৈরি হয়।
আগে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা কেনা হলেও পরে উন্মুক্ত দরপত্রের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ফলে—
অনুমোদনে সময় লাগে ২–৩ মাস
প্রতিটি টিকার জন্য আলাদা দরপত্র করতে হয়
বাস্তবে দীর্ঘ সময়েও টিকা সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি
ইউনিসেফ এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। সংস্থাটির প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বিষয়টিকে “হতাশাজনক” বলে উল্লেখ করেন।
📉 টিকাদানের হার কমে যাওয়া
এমআর-১ কভারেজ ১০০.১% থেকে কমে ৯২.৭৩%
এমআর-২ কভারেজ ৯৮.১% থেকে কমে ৯০.৭৮%
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে এই হার আরও কম হতে পারে।
📊 বর্তমান পরিস্থিতি
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত “হার্ড ইমিউনিটি” নেই, অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিশু টিকা পায়নি। ফলে হামের প্রাদুর্ভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
🗣️ সরকারের ব্যাখ্যা
অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, নতুন ব্যবস্থায় যেতে সময় লেগেছে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বিলম্ব হয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রথম দিকে সরকার আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা নিয়েই ব্যস্ত ছিল।
তবে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
⚠️ উপসংহার
হামের প্রাদুর্ভাব বর্তমানে দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

আজকের কথা ডেস্ক :