
২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা নিয়ে জুলাই শহীদ সংখ্যা বিতর্ক যেন কিছুতেই থামছে না। বিশেষ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের কার্যালয়ের (OHCHR) একটি ত্রুটিপূর্ণ রিপোর্ট এই বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে। ওই রিপোর্টে নিহতের যে সংখ্যা দাবি করা হয়েছে, তা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অফিশিয়াল গেজেটের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ।
অবশেষে জাতিসংঘের এই বিতর্কিত রিপোর্ট সংশোধন ও প্রত্যাহারের আইনি দাবি উঠেছে। সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় জাতিসংঘের হাই কমিশনারের কাছে এই বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছেন শেখ হাসিনার লিগ্যাল কাউন্সেল মি. স্টিভেন পাউলস কেসি।
লন্ডনের বিখ্যাত ‘ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্স’ (Doughty Street Chambers)-এর এই আইনি পরামর্শদাতা গত ২৮ মে ২০২৬ তারিখে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার মি. ভলকার তুর্ক (Mr. Volker Türk) -কে এই চিঠি পাঠান।
মূল বিবাদ: ওএইচসিএইচআর (OHCHR) ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট
২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের কার্যালয় থেকে “Human Rights Violations and Abuses related to the Protests of July and August 2024 in Bangladesh” শীর্ষক একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছিল। মি. স্টিভেন পাউলস কেসি তাঁর চিঠিতে এই রিপোর্টের কিছু তথ্যের তীব্র বিরোধিতা করে তা সংশোধন ও প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছেন।
চিঠিতে জুলাই শহীদ সংখ্যা বিতর্ক এবং জাতিসংঘের রিপোর্টের নিরপেক্ষতা নিয়ে মূলত তিনটি প্রধান আপত্তি ও আইনি যুক্তি উত্থাপন করা হয়েছে:
১. নিহতের সংখ্যা নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি ও বিভ্রান্তি
চিঠির সবচেয়ে বড় আপত্তিটি এসেছে নিহতের সংখ্যা নিয়ে। জাতিসংঘের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল যে, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।মি. পাউলস কেসি তাঁর চিঠিতে যুক্তি দেন যে, এই সংখ্যাটি অত্যন্ত ভুল এবং অতিরঞ্জিত। এর সপক্ষে তিনি দুটি সরকারি ও বেসরকারি তথ্য তুলে ধরেন।
সরকারি গেজেট: বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিজস্ব অফিশিয়াল গেজেট (*”The Gazette of Martyrs of the July Uprising 2024″*) অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা প্রায় ৮৩৪ জন। অর্থাৎ জাতিসংঘের দাবি করা সংখ্যার প্রায় অর্ধেক।
ছাত্রদের রিপোর্ট: এমনকি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নিজস্ব ওয়েবসাইট (shohid.info) অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৬৫০ জনের মতো দেখানো হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, যদি একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত করা হয়, তবে এই সংখ্যাটি আরও কম হতে পারে।
২. তদন্তের নিরপেক্ষতা ও নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন
চিঠিতে অভিযোগ করা হয় যে, এই তদন্তটি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমন্ত্রণে এবং তাদের প্রভাবেই করা হয়েছিল। যার ফলে এই রিপোর্টের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
পাশাপাশি তদন্তের সময়সীমা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। জাতিসংঘের এই তদন্তটি শুধুমাত্র ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট ২০২৪ সালের মধ্যকার ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে ১৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর যে ব্যাপক সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, তা এই রিপোর্টে পুরোপুরি চেপে যাওয়া হয়েছে।
৩. রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তথ্যের ব্যবহার
আইনজীবীর চিঠিতে স্পষ্ট অভিযোগ করা হয়েছে যে, শেখ হাসিনা যেন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন—এমন একটি মিথ্যা ন্যারেটিভ বা গল্প তৈরি করতেই এই অতিরঞ্জিত সংখ্যা (১,৪০০) ব্যবহার করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনা সরকারকে অসাংবিধানিকভাবে উৎখাত করার বিষয়টিকে বিশ্ববাসীর কাছে বৈধতা দেওয়া।
চিঠিতে আরও মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার নিজেই পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনা তদন্তে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত commission গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল।
জাতিসংঘের কাছে চূড়ান্ত আইনি অনুরোধ
চিঠির শেষ অংশে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের কার্যালয়ের (OHCHR) প্রতি সম্মান বজায় রেখেই দুটি চূড়ান্ত অনুরোধ জানানো হয়েছে:
১. ১,৪০০ জন নিহতের এই ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যটি জনসমক্ষে সংশোধন এবং প্রত্যাহার (Public Retraction and Correction) করতে হবে, যাতে জুলাই শহীদ সংখ্যা বিতর্ক চিরতরে অবসান ঘটে।
২. জাতিসংঘ যেন ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা সরকারের উদ্দেশ্য হাসিল কিংবা মিথ্যা প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

