ইতিহাসে বেইমানি বা বিশ্বাসঘাতকতার প্রাচীন প্রতীক বাংলাদেশের সেই মীরজাফরকেও পেছনে ফেলে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এখন তীব্র ক্ষোভের নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে ‘বিশ্বাবাটপার ইউনূস’ শব্দটি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ওঠা তীব্র জনরোষ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং গুরুতর আইনি লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে এই নতুন সম্বোধনটি এখন মুখে মুখে ঘুরছে।
জাতীয় দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’, ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘দৈনিক আজকের কথা’ এবং প্রবীণ সাংবাদিকদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা এই নজিরবিহীন গণঅসন্তুোষের চিত্রটি বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
‘৮০ ভাগ মানুষের দাবি বিশ্ববাটপার ইউনুসের ফাঁসি চাই’
পত্রিকার একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ ড. ইউনূসের ফাঁসির শাস্তি কামনা করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ১৮ মাসের শাসনামলে মব সহিংসতা, শত শত মানুষের হত্যা, খুন এবং ধর্ষণের মতো চরম অপরাধে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, তাঁর আমলে দেশের স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল।
সোশ্যাল মিডিয়ায় নজিরবিহীন ধিক্কার: এক পোস্টে ৪,০০০ গালি
দৈনিক আজকের কথা পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ড. ইউনূসের একটি ঈদ শুভেচ্ছা পোস্টে নেটিজেনরা তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।
মন্তব্যের অনুপাত: পোস্টটিতে আসা মোট ৬,০০০টি মন্তব্যের মধ্যে ৪,০০০টিরও বেশি মন্তব্যই ছিল সরাসরি নেতিবাচক এবং আক্রমণাত্মক।
সাধারণ ব্যবহারকারীরা তাঁকে ‘বাটপার’, ‘চিটার’, ‘সুদখোর’ ‘বিশ্ব বাটপার ইউনুস’, ‘রাজাকার’ এবং ‘দেশ ধ্বংসকারী’ বলে আখ্যায়িত করে গালিগালাজ করেছেন।
নোবেল বিতর্ক: ফেসবুকের মন্তব্যগুলোতে অনেকেই লিখেছেন, ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারটি গ্রামীণ ব্যাংকের দরিদ্র নারীদের কিস্তির টাকায় কেনা, যা তিনি নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন।
সাংবাদিক আনিস আলমগীরের কড়া চাবুক: ‘ইউনূস একটি বিশ্ব বাটপার’
ড. ইউনূসের এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীর। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা থেকে স্থায়ী জামিন পাওয়ার পর আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এবং বিভিন্ন টকশোতে তিনি ইউনূসের ১৮ মাসের আমলকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন।
‘দেশ বিক্রি ও ধ্বংসের’ অভিযোগ:
বার্তাবাজারের এক প্রতিবেদন অনুসারে আনিস আলমগীর সরাসরি অভিযোগ তোলেন, “ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিদায় নেওয়ার আগে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দিয়ে গেছেন। তিনি একজন ‘বিশ্ব বাটপার’।
ডাস্টবিন সংস্কৃতি ও বিভেদের রাজনীতি: একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের বরাতে বলা হয়, ইউনূস দেশে চরম প্রতিহিংসা এবং বিভক্তির রাজনীতি কায়েম করে সমাজকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছেন এবং দেশে একটি ‘ডাস্টবিন সংস্কৃতি’ চালু করেছিলেন।
প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের উৎসব: আনিস আলমগীর আরও বলেন, বিশ্ব বাটপার ইউনুস ১৮ মাসে বাংলাদেশের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছেন এবং নিজে কীভাবে চুরিচামারি করে লাভবান হওয়া যায়, তা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। এমনকি দেশে হামের টিকাদানে ব্যর্থতার কারণে শত শত শিশুর মৃত্যুর দায়ও তিনি ইউনূস প্রশাসনের ওপর চাপান।
সংবিধান লঙ্ঘন ও শপথ ভঙ্গের অকাট্য প্রমাণ
জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর একটি সম্পাদকীয় বিশ্লেষণে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের উদ্ধৃতি দিয়ে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে।
১৪৭ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন: বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালীন লাভজনক কোনো পদের সুবিধা নিতে পারেন না।
ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ: ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা পদে থেকে তাঁর নিজের ইউনূস সেন্টার এবং গ্রামীণ কল্যাণ সংস্থাকে বিপুল পরিমাণ কর অব্যাহতি ও আর্থিক সুবিধা পাইয়ে দিয়েছেন, নিজ নামে নিয়েছেন বিটকয়েন ব্যবসার ওয়ালেট লাইসেন্স ও আদম বেপারীর লাইসেন্স যা সুস্পষ্টভাবে সংবিধান লঙ্ঘন এবং শপথ ভঙ্গের শামিল।
‘জাতীয় প্রতারণার ১৮ মাস’: রাজনীতি ও অর্থনীতি ধ্বংসের অভিযোগ
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং সাবেক মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে কালের কণ্ঠে উল্লেখ করেছে, ইউনূস সরকারের ১৮ মাসের শাসনকাল ছিল মূলত ‘জাতীয় প্রতারণার এক দীর্ঘ দলিল’।
রাজনৈতিক বিভেদ: দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কারের নাম করে ড. ইউনূস রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কৃত্রিম বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।
অর্থ পাচার ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়: তাঁর সময়ে দেশ থেকে বিগত আমলের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে টকশো ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র দাবি উঠেছে।
শৈশবের চাতুরী থেকে বিশ্ব বাটপারির অভিযোগ
সমালোচকরা তাঁর অতীত জীবন ও আত্মজীবনীর তথ্য টেনে এনে বলছেন, ছোটবেলায় বিনামূল্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন পত্রিকা পাওয়ার জন্য কুইজ বিজয়ীদের নাম ভাঙিয়ে ঠিকানা বদলের যে চাতুরী তিনি করেছিলেন, সেই মানসিকতা তিনি আজও ধরে রেখেছেন। নোবেল পদকের লবিংয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ডলার সংগ্রহ এবং সর্বশেষ রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে কারাগার থেকে চিহ্নিত অপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে বিলিয়ন ডলার আয়ের যে অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে, তা তাঁকে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কিত করে তুলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের মানুষ এখন বুঝতে পারছে যে ড. ইউনূসের এজেন্ডা জনকল্যাণমূলক ছিল না, যার কারণে দেশ আজ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ‘আমও হারালো, ছালাও হারালো’র মতো অবস্থায় পড়েছে।

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী