প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মুরাদনগরে কিশোর গ্যাংয়ের রক্তাক্ত তাণ্ডব: দুই দিনে দফায় দফায় হামলা, আহত ২০, থানায় পৃথক ২ অভিযোগ

দফায় দফায় হামলা
আজকের কথা ডেস্ক

কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দারোরা ইউনিয়নের কাজিয়াতল গ্রামে পূর্ব শত্রুতা ও মোটরসাইকেল চালানোকে কেন্দ্র করে দুই দিনে দফায় দফায় সংঘটিত ভয়াবহ হামলায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে এক পক্ষের ৯ জন ও প্রতিপক্ষের ২ জনসহ মোট ১১ জন গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হামলার ঘটনায় একই আসামিদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে মুরাদনগর থানায় পৃথক দুটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কিশোর গ্যাং ও দাঙ্গাবাজ চক্র হিসেবে পরিচিত। তাদের ভয়ে সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পান না। সর্বশেষ এই ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

জানা যায়, গত ২৮ মে বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ১১টার দিকে কাজিয়াতল গ্রামের চাঁনগাজী মুন্সী বাড়িতে প্রথম হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, একই গ্রামের দুলাল মিয়ার ছেলে সাইদুল (২০) বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে মেকানিক শহিদ মুন্সীর বাড়ির সীমানা বেড়ার ওপর উঠিয়ে দিলে এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়।

একপর্যায়ে পূর্ব বিরোধের জের ধরে সাইদুল ও তার সহযোগীরা লোহার রড, লাঠি, বাঁশ এবং ধারালো দা নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে শহিদ মুন্সীর বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় বাড়ির লোকজনকে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয় এবং বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার পর আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে শহিদ মুন্সী বাদী হয়ে শুক্রবার রাতে মুরাদনগর থানায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ৪ থেকে ৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

কিন্তু প্রথম দিনের রক্তাক্ত হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই পরদিন ২৯ মে শুক্রবার আবারও একই পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, শুক্রবার সকালে কাজিয়াতল বাজার এলাকায় একা পেয়ে মোবারক হোসেনকে লোহার রড ও হকিস্টিক দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। পরে দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে তার কাকা রাজীব মুন্সীকে একা পেয়ে নাক, মুখ ও মাথায় এলোপাতাড়ি আঘাত করা হয়। হামলার সময় তার পরনের শার্ট ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং নগদ ১ হাজার ৫০০ টাকা ও প্রায় ১৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি স্মার্টফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

এই দ্বিতীয় হামলার ঘটনায় মৃত জলিল মুন্সীর ছেলে মোবারক মুন্সী বাদী হয়ে একই আসামিদের বিরুদ্ধে মুরাদনগর থানায় আরও একটি পৃথক অভিযোগ দায়ের করেন।

দুইটি অভিযোগে যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন— মো. সায়মন (২০), পিতা রবিউল; মো. সুজন (২০), পিতা মোকবল হোসেন; মো. সাইদুল (২০), পিতা দুলাল মিয়া; আনোয়ার হোসেন (৩০); দেলোয়ার হোসেন (৩৫); সাইদুল ইসলাম (২৪); মো. জহির (২৮), পিতা রবিউল; মো. সেলিম (৩৫), পিতা মোকবল হোসেন; মো. শফিক (৪০), পিতা আব্দুল খালেক এবং রাসেল মিয়া (২৭), পিতা ফজলু মিয়া। এছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও ৪ থেকে ৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দুই দিনের দফায় দফায় সংঘটিত হামলায় উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে গুরুতর জখম হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১১ জন। তাদের মধ্যে ভুক্তভোগী পরিবারের ৯ জন এবং প্রতিপক্ষের একই পরিবারের ২ জন সদস্য রয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগ দায়েরের পরও অভিযুক্তরা বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে। হামলার শিকার পরিবারটির সদস্যরা বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এমনকি এই প্রতিবেদন লেখার সময়ও নতুন করে হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে একজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন।

এ বিষয়ে শনিবার (৩০ মে) সকালে মুরাদনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে একই আসামিদের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্তদের একটি অংশ এলাকায় কিশোর গ্যাং হিসেবে পরিচিত। তারা প্রায়ই বিভিন্ন সংঘর্ষ, হামলা ও বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষ ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। সর্বশেষ এই হামলার ঘটনায় এলাকাজুড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

প্রিন্ট করুন