

অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও সেই সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, কর্মকাণ্ড, নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়া এবং উপদেষ্টাদের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনপরিসরে আলোচনা-সমালোচনা থামেনি। বরং সময় যত গড়াচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য, অভিযোগ ও বিতর্ক।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য সংকট, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সরকারের বিভিন্ন সময়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়তে দেখা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিশ্ববাটপার ইউনুস ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, মানববন্ধন এবং কুশপুত্তলিকা দাহের ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে, কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টার দেওয়া সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে কথিত ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর অস্তিত্ব, যা নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—ক্ষমতা ছাড়ার পর এখন কোথায় আছেন সেই আলোচিত উপদেষ্টারা? কী করছেন তাঁরা? কেন তাঁদের অনেককে জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছে না?
অন্তর্বর্তী সরকার বিদায়ের পর থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে তাদের আমলের আর্থিক কর্মকাণ্ড ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের তদন্ত দাবি ওঠে। সম্প্রতি বিএনপির সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান কিশোরগঞ্জের এক অনুষ্ঠানে অভিযোগ করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থপাচার হয়েছে এবং সে সময়ের কর্মকাণ্ড তদন্ত করা প্রয়োজন।
এর আগে গত এপ্রিলে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস দেন। এরপর থেকেই সাবেক উপদেষ্টাদের চলাফেরা, বিদেশ সফর এবং ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড নতুন করে আলোচনায় আসে।
দায়িত্ব ছাড়ার পর সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গুলশানের নিজস্ব বাসভবনে অবস্থান নেন। অসুস্থ স্ত্রীর দেখাশোনার পাশাপাশি তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের ‘থ্রি জিরো’ দর্শন—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ—নিয়ে কাজ করছেন বলে জানা যায়।
ঈদের আগে তিনি দীর্ঘদিনের সহকর্মী লামিয়া মোরশেদকে সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্স সফরে যান। পরে নেদারল্যান্ডস ও জার্মানিতেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ইউরোপ সফরের বিভিন্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও তিনি এ বিষয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা বলেননি।
সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন সম্প্রতি একাধিক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, আনুষ্ঠানিক উপদেষ্টা পরিষদের বাইরে সাত সদস্যের একটি অনানুষ্ঠানিক ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ ছিল, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, উপদেষ্টা থাকাকালে একাধিকবার তাঁর মন্ত্রণালয়ের কাজে অন্যদের হস্তক্ষেপ হয়েছে এবং তিনি অন্তত তিনবার পদত্যাগের চিন্তাও করেছিলেন।
এই বক্তব্য সামনে আসার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর একটি সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি গ্রামীণ ব্যাংকে ফিরে গেলেও সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য সংকটের পর থেকে অনেকটাই আড়ালে চলে গেছেন।
ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, তিনি বর্তমানে রাজধানীর একটি ফ্ল্যাটে সীমিত পরিসরে অবস্থান করছেন। গণমাধ্যম কিংবা সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগও অনেক কমিয়ে দিয়েছেন। এমনকি অনেক পরিচিতজনও তাঁর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে অবগত নন।
সাবেক সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকেই অনেকটা নীরব ছিলেন। সম্প্রতি স্ত্রী অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশাকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া সফরে যাওয়ার পর তাঁকে ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ দাবি করেন, তিনি আর দেশে ফিরবেন না। যদিও ফারুকী এসব গুঞ্জনকে ‘প্রোপাগান্ডা’ আখ্যা দিয়ে ফেসবুকে দীর্ঘ পোস্ট করেছেন। তবে তিনি কেন অস্ট্রেলিয়ায় গেছেন বা কবে ফিরবেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানাননি।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ইতোমধ্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় ফিরে গেছেন। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাত সংস্কারে পরামর্শক হিসেবেও কাজ করছেন।
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেছেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার তাঁর প্রতিষ্ঠান উবিনীগে ফিরে গেছেন এবং বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ে প্রকাশ্যে মতামত দিচ্ছেন।
পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও আবার বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা)-এর প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বর্তমানে অনেকটাই ব্যক্তিগত সময় কাটাচ্ছেন। একইভাবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন গবেষণা ও লেখালেখিতে সময় দিচ্ছেন।
খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদারও লেখালেখি করছেন এবং তিনিও প্রকাশ্যে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন আবার নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আকিজ-বশির গ্রুপে ফিরেছেন। অন্যদিকে শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান তাঁর প্রতিষ্ঠিত মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর কার্যক্রমে যুক্ত হলেও জনসমক্ষে খুব কমই দেখা যাচ্ছে তাঁকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান একমাত্র ব্যক্তি, যিনি নতুন সরকারেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। তিনি বর্তমানে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সাবেক উপদেষ্টাদের অনেকের মধ্যেই এখনো ‘মব আতঙ্ক’ কাজ করছে। দায়িত্ব ছাড়ার পর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা এবং নানা অভিযোগের কারণে তারা জনসমাগম এড়িয়ে চলছেন। ফলে অনেকেই আগের কর্মস্থলে ফিরলেও নিয়মিত অফিস করছেন না কিংবা জনসমক্ষে উপস্থিতি সীমিত রেখেছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হলেও তাদের সময়ের নানা সিদ্ধান্ত, বিতর্কিত চুক্তি, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং কথিত ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্নের পুরোপুরি উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। বরং সাবেক উপদেষ্টাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও অবস্থান নতুন করে সেই সময়ের কর্মকাণ্ডকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যদি কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা পর্যালোচনা হয়, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত ও নেপথ্যের ঘটনাই হয়তো আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসবে।