গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি, তদন্তে মিলছে নতুন তথ্য; ডিএনএ বিশ্লেষণে শনাক্ত চারজনের উপস্থিতি
দীর্ঘ এক দশক ধরে আলোচিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। মামলায় সন্দেহভাজন দুই সাবেক সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (৮ জুন) বিকেলে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মো. মুমিনুল হক এ আদেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা আদালত পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম আদালতে আবেদন করে দুই সাবেক সেনাসদস্য জাহিদুজ্জামান ওরফে জাহিদ এবং শাহীন আলমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির অনুমতি চান। শুনানি শেষে আদালত আবেদন মঞ্জুর করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তনু হত্যাকাণ্ডের সময় জাহিদুজ্জামান কুমিল্লা সেনানিবাসের ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার গড়ঘাটা এলাকায়। অপরদিকে শাহীন আলম সে সময় কুমিল্লা সেনানিবাসের ২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পীরযাত্রাপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে। দুইজনই বর্তমানে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, শাহীন আলম বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
এর আগে গত ২২ এপ্রিল রাজধানীর কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। একই দিন ঢাকার সিআইডি ডিএনএ ল্যাবে তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে আদালতের অনুমতিতে তাকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, হাফিজুর রহমানের ডিএনএ পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনো হাতে আসেনি। তবে চলমান তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, তনুর পরিধেয় পোশাক থেকে সংগৃহীত আলামত পুনরায় বিশ্লেষণ করে আরও একজন ব্যক্তির সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ফলে ডিএনএ পরীক্ষায় মোট চারজনের জৈবিক নমুনার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পূর্বে তিনজনের শুক্রাণুর অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও নতুনভাবে শনাক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে রক্তের নমুনা পাওয়া গেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তার ভাষ্য, চারজনের মধ্যে একজন হিসেবে হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং অন্যান্য সন্দেহভাজনদের বিষয়েও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনি শেষে বাড়ি ফেরার পথে নিখোঁজ হন ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু। পরদিন সেনানিবাসের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন তার বাবা ইয়ার হোসেন।
দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রথমে থানা পুলিশ, পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং পরবর্তীতে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) করলেও হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। পরে ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি সিআইডি থেকে পিবিআই সদর দপ্তরে হস্তান্তর করা হয়।
দীর্ঘ তদন্তের ধারাবাহিকতায় মামলাটি বর্তমানে পিবিআইয়ের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। নতুন তথ্য ও আদালতের সাম্প্রতিক আদেশের পর বহুল আলোচিত তনু হত্যা মামলার তদন্তে নতুন অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী