
নাটোর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে নারী ধর্ষণের অভিযোগ, ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল; আটক ৩
নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে অসুস্থ শিশুর চিকিৎসার জন্য আসা এক নারীকে ধর্ষণ এবং সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে তিন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় হাসপাতালজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) ভুক্তভোগী নারীর বাবা বাদী হয়ে নাটোর সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করলে পুলিশ অভিযুক্ত তিনজনকে আটক করে।
আটক ব্যক্তিরা হলেন—হাসপাতালের আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী অমিত (২৩), অনিল (২৪) ও প্রাঙ্গন (২৩)।
মামলা ও ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, নাটোর সদর উপজেলার বাসিন্দা ওই নারী তার দুই বছর বয়সী অসুস্থ কন্যাকে গত ৫ জুন নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করেন। স্বামী কর্মসূত্রে বাইরে থাকায় তিনি একাই হাসপাতালে মেয়ের দেখাশোনা করছিলেন।
অভিযোগে বলা হয়, গত রোববার (৭ জুন) রাত প্রায় ১০টার দিকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী অমিত ওষুধ দেওয়ার কথা বলে ওই নারীকে ওয়ার্ড থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে হাসপাতালের ছয়তলার সিঁড়িঘরে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয়। এ সময় অপর দুই অভিযুক্ত অনিল ও প্রাঙ্গন ঘটনাটি মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর দাবি, পরে সেই ভিডিও দেখিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করা হয় এবং অন্য দুই অভিযুক্তও তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য চাপ ও হুমকি দিতে থাকে।
এদিকে দীর্ঘ সময় মাকে দেখতে না পেয়ে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি শিশুটি কান্নাকাটি শুরু করলে বিষয়টি হাসপাতালের দায়িত্বরত নার্স ও কর্মচারীদের নজরে আসে। পরে হাসপাতালের আনসার সদস্যরা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে ছয়তলার সিঁড়ি এলাকায় সন্দেহজনক অবস্থান শনাক্ত করেন।
এরপর আনসার সদস্য ও হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী ঘটনাস্থলে গিয়ে ভুক্তভোগী নারীকে উদ্ধার করেন এবং অভিযুক্তদের আটক করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়ে যান।
তবে ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনাটি জানার পরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক কোনো প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেয়নি। বরং অভিযুক্তদের ছেড়ে দেওয়া হয় এবং ঘটনাটি প্রকাশ না করার জন্য ভুক্তভোগীকে নিরুৎসাহিত করা হয়।
ভুক্তভোগীর স্বামী অভিযোগ করেন, পরদিন সকালে হাসপাতালে এসে তিনি স্ত্রী ও সন্তানকে ওয়ার্ডে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে পুরো ঘটনার বিষয়ে জানতে পারেন। কিন্তু হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অনেকেই হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
নাটোর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনসুর রহমান বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পরপরই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে এবং ডাক্তারি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. মশিউর রহমান বলেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে। মামলা দায়েরের পর অভিযুক্ত তিনজনকে আটক করা হয়েছে। ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে পুলিশ তদন্ত অব্যাহত রেখেছে।