কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার তবকপুর ইউনিয়নে সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন একটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের পর এক সাংবাদিককে হুমকি এবং তার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রকৌশলী প্রদীপ কুমারের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনাটি স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন মহলের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি তবকপুর ইউনিয়নের একটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, রাতের আঁধারে কার্পেটিং কাজ পরিচালনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
ওই প্রতিবেদনে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তেমন কোন কার্যকর তদারকি দৃশ্যমান দেখা যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, সংবাদ প্রকাশের পর উপজেলা প্রেসক্লাবের তথ্যবিষয়ক সম্পাদক ও সাংবাদিক সোহেল রানার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে অসন্তোষ প্রকাশ করেন উপজেলা প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার। একটি কল রেকর্ডের সূত্র ধরে জানা যায়, সংবাদ প্রকাশের দুই দিন আগে সড়ক নির্মাণকাজের অনিয়ম সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হলে তিনি বলেন, “কাজ বন্ধ না করলে আমি কি মারামারি করে কাজ বন্ধ করব?”
একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, অনিয়মের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তিনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে চিঠি দিয়েছেন বলেও নিশ্চিত করেন।
তবে অভিযোগকারীদের দাবি, পরবর্তীতে সরেজমিনে গিয়ে তারা দেখেন অভিযোগ ওঠার পরও রাতের আঁধারে সড়কে কার্পেটিংয়ের কাজ চলমান ছিল। এ বিষয়ে পুনরায় উপজেলা প্রকৌশলীকে অবহিত করা হলে তিনি আগের বক্তব্য থেকে সরে এসে তা সম্পূর্ন অস্বীকার করেন বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক।
এ সময় সাংবাদিককে উদ্দেশ করে উপজেলা প্রকৌশলী বলেন, “আপনি এমন ভাব নিচ্ছেন যে ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানেন না।”
সাংবাদিক সমাজের মতে, এ ধরনের মন্তব্য একজন পেশাদার গণমাধ্যমকর্মীর প্রতি অসম্মানজনক এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ।
উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ফিরোজ কবির কাজলসহ স্থানীয় সাংবাদিকরা বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরা গণমাধ্যমের দায়িত্ব। কিন্তু কোনো সংবাদ প্রকাশের জেরে যদি একজন সরকারি কর্মকর্তা সাংবাদিককে চাপ প্রয়োগ, হুমকি কিংবা হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেন, তাহলে তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতির পরিপন্থী।
এদিকে সচেতন নাগরিকদের দাবি, তবকপুর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে উত্থাপিত অনিয়মের অভিযোগ, রাতের বেলায় কাজ পরিচালনার বিষয় এবং সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ—সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত। একইসঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণবিধি মেনে চলা এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে পেশাদার সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী প্রদীপ কুমারের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
কুড়িগ্রাম এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, “একজন উপজেলা প্রকৌশলীর কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ বা হুমকিমূলক বক্তব্য প্রত্যাশিত নয়। গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে এলজিইডির কর্মকর্তাদের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।”
এ ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন, যদি উপজেলা প্রকৌশলী প্রকল্পের অনিয়ম সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত হয়ে থাকেন এবং কাজ বন্ধে চিঠি দেওয়ার দাবি করে থাকেন, তাহলে অভিযোগ ওঠার পরও কাজ কীভাবে চলতে থাকে? আবার যদি কোনো অনিয়ম না হয়ে থাকে, তাহলে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের প্রয়োজন কেন দেখা দিল?
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী, সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন নাগরিকরা।

আজকের কথা ডেস্ক