প্রিন্ট এর তারিখঃ বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

রক্তদাতার খোঁজে আর নয় ভোগান্তি, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবন ‘ব্লাডরিচ’

ব্লাডরিচ ওয়েব অ্যাপ
মো. মুশফিকুর রহমান তুহিন, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় :

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবন ‘ব্লাডরিচ’: এক ক্লিকেই মিলবে রক্তদাতা

জরুরি মুহূর্তে রক্তের সন্ধানে মানুষের দুর্ভোগ কমাতে এবং রক্তদাতা ও রক্তগ্রহীতার মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ নিয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককানইবি) তিন শিক্ষার্থী। তাঁদের উদ্ভাবিত ‘ব্লাডরিচ’ (BloodReach) নামের আধুনিক ওয়েব অ্যাপ ইতোমধ্যে রক্তসেবা কার্যক্রমে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ইয়াসিন ইসলাম, ফারহানা আক্তার ইশা এবং মো. তৌফিক হোসেন শিমুলের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, গবেষণা ও প্রচেষ্টার ফল এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। গত ৩ জুন ২০২৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ব্লাডরিচ’ সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বর্তমানে ৩৭ জন স্বেচ্ছাসেবী তরুণ-তরুণী প্ল্যাটফর্মটির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

উদ্যোক্তারা জানান, রক্তদানের সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকেই এ উদ্যোগের সূচনা। ব্লাডরিচের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মো. ইয়াসিন ইসলাম কলেজ জীবন থেকেই নিয়মিত রক্তদাতা হিসেবে কাজ করছেন। স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে যুক্ত থেকে তিনি দেখেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ব্লাড ডোনেশন গ্রুপ থাকলেও জরুরি মুহূর্তে কাঙ্ক্ষিত রক্তদাতাকে দ্রুত খুঁজে পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এই বাস্তব সমস্যা থেকেই ব্লাডরিচ তৈরির চিন্তা মাথায় আসে।

জরুরি মুহূর্তে রক্তের জন্য ভোগান্তি কমাতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীর উদ্ভাবন ‘ব্লাডরিচ’ (BloodReach) ওয়েব অ্যাপ ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। ব্লাড গ্রুপ ও অবস্থানভিত্তিক দ্রুত রক্তদাতা খুঁজে পাওয়া, সরাসরি যোগাযোগ, ইমার্জেন্সি রিকোয়েস্ট এবং স্বয়ংক্রিয় ডোনার ম্যানেজমেন্ট সুবিধাসহ সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি এই প্ল্যাটফর্মটি দেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল রক্তসেবা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। বর্তমানে ৩৭ জন স্বেচ্ছাসেবী এর কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

প্রথমে একটি সাধারণ গুগল শিটে রক্তদাতাদের তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর চালু করা হয় ব্লাডরিচের ফেসবুক পেজ। ধীরে ধীরে পরিকল্পনাটি আরও বিস্তৃত রূপ নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের পরামর্শ ও উৎসাহে এবং নিজেদের সঞ্চিত অর্থে তৈরি করা হয় পূর্ণাঙ্গ ওয়েব অ্যাপটি।

ব্লাডরিচের প্রধান লক্ষ্য হলো কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই রক্তগ্রহীতাকে সরাসরি রক্তদাতার সঙ্গে যুক্ত করা। ব্যবহারকারীরা ব্লাড গ্রুপ ও অবস্থানভিত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে মুহূর্তেই সম্ভাব্য রক্তদাতার তথ্য খুঁজে পেতে পারেন। এছাড়া ওয়েব অ্যাপ থেকেই ডোনারের মোবাইল নম্বর বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে।

ব্যবহারকারীদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে প্ল্যাটফর্মটিতে যুক্ত করা হয়েছে বেশ কিছু আধুনিক ফিচার। একজন রক্তদাতা রক্ত দেওয়ার পর তাঁর প্রোফাইল স্বয়ংক্রিয়ভাবে চার মাসের জন্য অদৃশ্য (হাইড) হয়ে যায়। ফলে ওই সময়ের মধ্যে তাঁকে বারবার ফোন বা অনুরোধের সম্মুখীন হতে হয় না। নির্ধারিত সময় শেষে প্রোফাইলটি আবার সক্রিয় হয়ে যায়।

এছাড়া গুগল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে মাত্র এক ক্লিকেই নিবন্ধন করা যায়। জরুরি রক্তের প্রয়োজন হলে ব্যবহারকারীরা সরাসরি ব্লাড রিকোয়েস্ট পোস্ট করার সুযোগও পাচ্ছেন।

উদ্যোক্তারা জানান, কোনো বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা করপোরেট সহায়তা ছাড়াই সম্পূর্ণ সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এই উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে। তাঁদের লক্ষ্য ব্লাডরিচকে দেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর রক্তসেবা প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তাঁরা জানান, দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ব্লাডরিচের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ মোবাইল অ্যাপ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল, ব্লাড ব্যাংক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

তরুণ উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে রক্তসংকটজনিত দুর্ভোগ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সেই লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে চলছে ব্লাডরিচ।
বর্তমানে ইন্টারনেট সংযোগ এবং একটি গুগল অ্যাকাউন্ট থাকলেই যে কেউ BloodReach প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়ে রক্তদাতা হিসেবে নিবন্ধন করতে অথবা প্রয়োজনীয় রক্তের সন্ধান পেতে পারেন। জীবন বাঁচানোর এই ডিজিটাল উদ্যোগ ইতোমধ্যেই সচেতন মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

প্রিন্ট করুন