প্রিন্ট এর তারিখঃ সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

শিবির নেতা জিসান অপহৃত নন, ‘ধর্ষণ মামলার চাপ’ এড়াতে আত্মগোপন করেছিলেন: পুলিশের দাবি

শিবির নেতা জিসান
মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী, সম্পাদক :

অপহরণ রহস্যে নতুন মোড়, লাকসাম থেকে উদ্ধারের পর সামনে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে নিখোঁজ হওয়া এবং পরে ‘অপহৃত’ দাবি করা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান আহমেদকে ঘিরে নতুন মোড় নিয়েছে আলোচিত ঘটনাটি। পুলিশের দাবি, বহুল আলোচিত এই ঘটনায় কোনো অপহরণের ঘটনা ঘটেনি। বরং এক নারীর করা ধর্ষণ মামলার অভিযোগ ও বিয়ের চাপ এড়াতেই তিনি পরিকল্পিতভাবে আত্মগোপনে ছিলেন।

শুক্রবার (১২ জুন) রাতে কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে জংশন এলাকা থেকে জিসানকে উদ্ধার করার পর তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ এ দাবি করেছে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

জিসান আহমেদ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং কুমিল্লা (পশ্চিম) জেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি। তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর দলীয় নেতাকর্মী, পরিবারের সদস্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ‘অপহৃত’ দাবি করে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়।

নিখোঁজ থেকে ‘অপহরণ’ প্রচার

পরিবারের দাবি অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাতে ঢাকা থেকে নিজ বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বিরবাগগোয়ালী গ্রামে ফিরছিলেন জিসান। পথে তিনি দাউদকান্দি মডেল মসজিদে এশার নামাজ আদায় করেন। এরপর থেকেই তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

পরিবার জানায়, রাত ৮টা ২৯ মিনিটে জিসানের ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে সর্বশেষ অনলাইন দেখা যায়। এরপর তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং ফেসবুক অ্যাকাউন্টও ডিঅ্যাক্টিভেটেড অবস্থায় দেখা যায়।

এ ঘটনায় তার বড় ভাই রাসেল আহমেদ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জিসানকে ‘অপহরণ’ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে ভিন্ন তথ্য

কুমিল্লা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তদন্তে অপহরণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। বরং এক নারীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বিয়ের প্রতিশ্রুতি এবং পরবর্তীতে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করেই জিসান আত্মগোপনে যান।

পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২০ মে দাউদকান্দির একটি ভাড়া বাসায় বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক নারীকে ধর্ষণ করার অভিযোগ রয়েছে জিসানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই নারী পরবর্তীতে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন এবং তার গর্ভপাত করানো হয়।

এ ঘটনার পর ওই নারী জিসানের ওপর বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করলে তিনি বিয়ে করতে সম্মত হন বলে জানা যায়। তবে নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে আসতেই তিনি হঠাৎ আত্মগোপনে চলে যান।

পুলিশের দাবি, ঘটনাকে ‘অপহরণ’ হিসেবে প্রচার করে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

জিসানের বিরুদ্ধে মামলা

পুলিশ জানায়, জিসানকে উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর শুক্রবার রাতে ওই নারী বাদী হয়ে দাউদকান্দি মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।

মামলায় ধর্ষণ, ধর্ষণে সহযোগিতা এবং ভ্রূণ নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছে। জিসানকে প্রধান আসামি করে মোট চারজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

বর্তমানে মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

যা বললেন পুলিশ সুপার

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন,

“জিসান আহমেদকে উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তে আমরা অপহরণের কোনো প্রমাণ পাইনি। প্রাথমিকভাবে যা তথ্য পেয়েছি, তাতে তিনি নিজেই আত্মগোপনে ছিলেন। একজন নারী তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন এবং বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।”

রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড়

জিসান নিখোঁজ হওয়ার পর বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত জিসানকে উদ্ধারের আহ্বান জানান।

তিনি লিখেছিলেন, “১৮ ঘণ্টা অতিক্রম হওয়ার পরও জিসানকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

অন্যদিকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকেও জিসানকে ‘নিখোঁজ’ উল্লেখ করে বিবৃতি দেওয়া হয়।

তবে পুলিশের সর্বশেষ বক্তব্য এবং মামলার তথ্য প্রকাশের পর পুরো ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।

তদন্ত চলমান

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ঘটনাটির সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জিসানের বক্তব্য, মামলার অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্টদের তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একদিকে ‘অপহরণ’ দাবির নাটকীয় প্রচারণা, অন্যদিকে ধর্ষণ মামলা ও আত্মগোপনের অভিযোগ—সব মিলিয়ে শিবির নেতা জিসানকে ঘিরে ঘটনাটি এখন কুমিল্লাসহ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।


প্রিন্ট করুন