প্রিন্ট এর তারিখঃ বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

ভূ-সীমানার চেয়ে মানুষ বড়

সীমান্তে পুশইন সংকট
পুলক ঘটক

সীমান্তের কাঁটাতারে আটকে থাকা মানবতার গল্প

— পুলক ঘটক

দেড় বছরের একটি শিশু। কুষ্টিয়ার প্রাগপুর সীমান্তে মায়ের কোলে আধশোয়া হয়ে আছে। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ, পায়ের নিচে ধুলোমাখা মাটি, সামনে কাঁটাতারের বেড়া, পেছনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। সে জানে না রাষ্ট্র কী, সীমান্ত কী, নাগরিকত্ব কী কিংবা কূটনীতি কী। সে শুধু জানে তার ক্ষুধা পেয়েছে, তৃষ্ণা পেয়েছে, সে ক্লান্ত।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা থেকে উঠে আসা এমন দৃশ্য শুধু একটি সীমান্ত বিরোধের গল্প নয়; এটি মানবতার এক নির্মম পরীক্ষার গল্প।

কুষ্টিয়া, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ, যশোর, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা কিংবা সিলেট—সীমান্তের একের পর এক এলাকায় দেখা গেছে অসহায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের। কেউ কাঁটাতারের এপারে, কেউ ওপারে, আবার কেউ নো-ম্যানস-ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন—কোন দেশ তাদের নিজের বলে স্বীকার করবে সেই আশায়।

কেউ দাবি করছেন তারা বাংলাদেশের নাগরিক। কেউ বহু বছর আগে কাজের সন্ধানে ভারতে গিয়েছিলেন। কারও নাগরিকত্ব নিয়ে দুই দেশের প্রশাসনের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু একটি বিষয়ে কোনো মতবিরোধ থাকার কথা নয়—

তারা সবাই মানুষ।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাম্প্রতিক বিতর্কে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হচ্ছে এই মানবিক সত্যটিই।

চারদিকে আমরা শুনছি ‘পুশ-ইন’, ‘পুশ-ব্যাক’, ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’, ‘জাতীয় নিরাপত্তা’, ‘সীমান্ত সুরক্ষা’, ‘কূটনৈতিক প্রতিবাদ’ কিংবা ‘রাজনৈতিক অবস্থান’—কিন্তু মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর আর্তনাদ যেন ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন মাসের শুরুতেই সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে একাধিক পুশ-ইনের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে শত শত মানুষকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংখ্যার হিসেবে কিছু অমিল থাকতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই—সমস্যাটি বাস্তব এবং ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।

প্রশ্ন হলো, এই মানুষগুলো কারা?

তারা কি সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক?

নাকি তাদের মধ্যে এমন মানুষও আছেন, যাদের পরিচয় নিয়ে দুই দেশের প্রশাসনের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে?

জামালপুর সীমান্তে ষষ্টি চন্দ্র বর্মণের ঘটনাটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়েছিল। কেউ বলেছিলেন তিনি ভারতের নাগরিক, কেউ দাবি করেছিলেন তিনি বাংলাদেশি। পরে প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ে জানা যায়, তিনি বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার বাসিন্দা।

এই ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, নাগরিকত্ব অনুমানের বিষয় নয়।

ভাষা, পোশাক কিংবা চেহারা দেখে কোনো মানুষের জাতীয়তা নির্ধারণ করা যায় না। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য নথি, প্রশাসনিক তদন্ত এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সমন্বয়।

সেখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে আসে।

যদি এসব মানুষ সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের কেন আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে?

আর যদি তারা বাংলাদেশের নাগরিক না হন, তাহলে কী ভিত্তিতে তাদের বাংলাদেশ সীমান্তে এনে ফেলে রাখা হচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সীমান্তে নয়, দুই দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেও খুঁজতে হবে।

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘অবৈধ অভিবাসন’ বহুদিনের একটি আলোচিত ইস্যু। বিশেষ করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে এটি নির্বাচনী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বছরের পর বছর ধরে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ প্রশ্নটি রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নিরাপত্তা ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।

বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন।

কিন্তু সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কাছে এটি বেঁচে থাকার প্রশ্ন।

এটাই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

একজন মা যখন শিশুকে বুকে নিয়ে দিনের পর দিন সীমান্তে অপেক্ষা করেন, তখন তার কাছে কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ একটি নিরাপদ আশ্রয়। একজন বৃদ্ধ যখন জানেন না তিনি কোন দেশে ফিরবেন, তখন তার কাছে জাতীয় রাজনীতির চেয়ে বেশি জরুরি একবেলা খাবার এবং নিরাপত্তা।

সমস্যার আরেকটি দিকও আমাদের স্বীকার করতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ বছরের পর বছর ধরে জীবিকার সন্ধানে ভারতে গেছেন। কেউ শ্রমিক হিসেবে, কেউ নির্মাণকর্মী, কেউ গৃহকর্মী হিসেবে। এটি কোনো গোপন সত্য নয়।

তবে এটিও সত্য যে উন্নত জীবন ও কর্মসংস্থানের আশায় সীমান্ত অতিক্রম করা শুধু বাংলাদেশিদের বৈশিষ্ট্য নয়।

মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা থেকে ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য—বিশ্বের সর্বত্র মানুষ জীবিকার তাগিদে সীমান্ত পাড়ি দেয়।

এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের বাস্তব চিত্র।

কাজ যেখানে আছে, মানুষ সেখানে যাবে। সুযোগ যেখানে আছে, মানুষ সেখানে পৌঁছাতে চাইবে।

তাই অভিবাসনের প্রশ্নকে শুধু আইন-শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সমাধান আসবে না।

আবার রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষার অধিকারও অস্বীকার করা যায় না।

তাই সমাধান হতে হবে যৌথ, ন্যায়সঙ্গত এবং মানবিক।

ভারত যদি মনে করে কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক, তাহলে তার পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ যদি যাচাই করে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে, তাহলে তাকে গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের বহু দেশ এভাবেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

প্রয়োজন কার্যকর দ্বিপক্ষীয় কাঠামো, দ্রুত তথ্য যাচাই ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

দুঃখজনকভাবে পুরো আলোচনায় আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—অতি-জাতীয়তাবাদ।

একপক্ষ সব দায় ভারতের ওপর চাপাচ্ছে।

অন্যপক্ষ সীমান্ত পার হওয়া প্রতিটি মানুষকে অপরাধী হিসেবে চিত্রিত করছে।

দুই অবস্থানই মানবিক ও বাস্তবসম্মত নয়।

ভারতকে গালমন্দ করলে সীমান্তে আটকে থাকা শিশুটির ক্ষুধা মিটবে না।

আবার জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে একজন বৃদ্ধকে দিনের পর দিন নো-ম্যানস-ল্যান্ডে ফেলে রাখাও কোনো সভ্য রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সীমান্ত পাহারা দেওয়া নয়; মানুষের মর্যাদা রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

আজ সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখে যে আতঙ্ক, তা শুধু তাদের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়; এটি আমাদের সময়েরও একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়। ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, নদী, অর্থনীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে দুই দেশ গভীরভাবে সংযুক্ত।

সেই সম্পর্কের মাঝখানে কোনো শিশুর রাত কাটানো উচিত নয় কাঁটাতারের বেড়ার পাশে।

আজ প্রয়োজন উত্তেজনা নয়, সমাধান।

প্রয়োজন নতুন করে একটি কার্যকর প্রত্যাবাসন চুক্তি।

প্রয়োজন দ্রুত নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আধুনিক ব্যবস্থা।

প্রয়োজন সীমান্তে আটকে পড়া মানুষদের জন্য মানবিক সহায়তা।

প্রয়োজন রাজনৈতিক স্লোগানের পরিবর্তে বাস্তব পদক্ষেপ।

কারণ কুষ্টিয়ার সেই শিশুটি, জামালপুরের সেই বৃদ্ধ কিংবা পঞ্চগড়ের সেই পরিবার—তারা কেউ ভূরাজনীতির খেলোয়াড় নয়। তারা শুধু মানুষ।

আর ইতিহাস শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে তার সীমান্তের কড়াকড়ি দিয়ে নয়, মানুষের প্রতি আচরণ দিয়েই বিচার করে।

সেই বিচারে আজ বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই—

তারা কি সীমান্তকে বড় করবে, নাকি মানুষকে?

কারণ সত্যটি খুবই সহজ—

ভূ-সীমানার চেয়ে মানুষ বড়।

লেখক: সাংবাদিক, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু আইন সংস্কার পরিষদ। ghatack@gmail.com

প্রিন্ট করুন