প্রিন্ট এর তারিখঃ রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

উন্নয়নের নামে ধ্বংসযজ্ঞ, কথিত নদী খননের মাটিতে চাপা শতাধিক ঘর

নদী খননের মাটিতে আশ্রয়ণ ঘর ধ্বংস
আজকের কথা ডেস্ক

সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর একসময় ছিল মাথা গোঁজার শেষ ঠিকানা। সেই ঘর পেয়েই নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন পারুল বেগম, রাবেয়া বেগম, হাজেরা, রিজিয়াদের মতো শতাধিক ভূমিহীন ও অসহায় পরিবার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ চাপা পড়েছে নদী খননের নামে ফেলা বিশাল মাটির স্তূপের নিচে। উন্নয়নের যে প্রকল্প মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার কথা, সেই প্রকল্পের মাটিই এখন কেড়ে নিয়েছে তাদের শেষ সম্বল।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আপার ভদ্রা নদী পুনঃখনন প্রকল্পের মাটি ফেলার কারণে চুকনগর, কাঁঠালতলা ও বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের শতাধিক ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও ঘরের চাল ভেঙে গেছে, কোথাও দরজা-জানালা মাটিচাপা পড়েছে, আবার কোথাও পুরো ঘরই মাটির স্তূপের নিচে হারিয়ে গেছে। ফলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের শতাধিক পরিবার এখন কার্যত গৃহহীন।

চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, হাতে ছোট্ট একটি লোহার টুকরা নিয়ে নিজের মাটিচাপা ঘরের ইট খুঁড়ে বের করার চেষ্টা করছেন পারুল বেগম। একসময় যে ঘরটি ছিল তার নিরাপদ আশ্রয়, আজ সেটির কোনো অস্তিত্বই চোখে পড়ে না। মাথার ওপর উঁচু মাটির ঢিবি, আর তার নিচে চাপা পড়ে আছে ঘর, স্মৃতি ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

পারুল বলেন, “ঘরটা আর ফেরত পাব কি না জানি না। তাই অন্তত ইটগুলো তুলে রাখছি। যদি কোনোদিন আবার ঘর বানানোর সুযোগ হয়।”

চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের অধিকাংশই এখন স্থানীয় গরুর হাটের মাঠে অস্থায়ী ছাউনিতে বসবাস করছেন। বৃষ্টি হলেই সেখানে পানি জমে যায়। নেই নিরাপদ টয়লেট, নেই বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা।

রিজিয়া বেগম বলেন, “পাঁচ-ছয় মাস ধরে মাঠে আছি। আমাদের ঘর ভেঙে দিয়েছে। বাথরুম নেই, টিউবওয়েল নেই। একটু বৃষ্টি হলেই পানির মধ্যে থাকতে হয়। ভোটের আগে অনেক আশ্বাস পেয়েছি, কিন্তু এখন কেউ খোঁজ নেয় না।”

হাজেরা বেগমের কণ্ঠেও একই হতাশা। তিনি বলেন, “ঘর বাঁচানোর সুযোগই পাইনি। শুধু টিনগুলো খুলে রাখতে পেরেছিলাম। এখন গরুর হাটে থাকি। সেখান থেকেও উঠে যেতে বলে।”

রাবেয়া বেগমের প্রশ্ন আরও তীব্র—“আমাদের ঘর নেই, বাথরুম নেই, মাথা গোঁজার জায়গা নেই। তাহলে আমরা কোথায় যাব?”

শুধু চুকনগর নয়, একই চিত্র কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পেও। সেখানে অন্তত ১৩টি ঘর মাটির চাপে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে।

তানিয়া বেগম বলেন, “ঘরের চালে মাটি উঠে গেছে, বারান্দা ভেঙে পড়েছে। ভয় নিয়ে বসবাস করছি। কখন কী হয় বলা যায় না।”

বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পেও ২৪টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে ঘরের ওপর মাটি ফেলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অভিযোগ করছে, নদী খননের মাটি সরানোর আগেই নতুন করে মাটি ফেলায় বিপর্যয় আরও বেড়েছে।

তপতী দাস বলেন, “মাটির চাপে দরজা-জানালা খোলা যায় না। টয়লেট বন্ধ হয়ে গেছে। ঘর মেরামত হচ্ছে, কিন্তু স্বাভাবিক জীবন ফেরেনি।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে ও ওপর মাটি ফেলা হয়েছে। ফলে যাদের জন্য সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ঘর নির্মাণ করেছিল, তারাই আজ আবার আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন।

উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নদী খনন প্রকল্পটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনী বাস্তবায়ন করছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে এবং কিছু স্থানে মাটি অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে।

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। যাদের ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে আলোচনা চলছে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—যে আশ্রয়ণ প্রকল্পকে সরকারের অন্যতম সফল মানবিক উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়, সেই প্রকল্পের ঘরগুলোই যদি উন্নয়ন কাজের কারণে মাটিচাপা পড়ে, তাহলে দায় কার? পুনর্বাসনের আগে কেন মানুষের শেষ আশ্রয় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হলো?

ভদ্রা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা মাটির বিশাল স্তূপ যেন এখন উন্নয়নের এক নির্মম প্রতীক। যেখানে প্রকল্প এগিয়েছে, কিন্তু পিছিয়ে গেছে মানুষের জীবন। আর ঘরহারা পরিবারগুলোর চোখে আজ একটাই প্রশ্ন—“আমাদের ঘর কবে ফিরবে?”

প্রিন্ট করুন