
যুদ্ধের ময়দান থেকে শিক্ষার আলোয়: ক্যাপ্টেন সুজাত আলীর অনুকরণীয় যাত্রা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে কিছু মানুষের নাম প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তেমনই এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ ইউনিয়নের গৌরসার গ্রামের কৃতি সন্তান ক্যাপ্টেন (অব.) সুজাত আলী। তিনি ছিলেন একাধারে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাবেক সংসদ সদস্য, শিক্ষানুরাগী ও জননেতা। কর্মময় জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি রেখে গেছেন দেশপ্রেম, নেতৃত্ব ও জনসেবার অনন্য দৃষ্টান্ত।
১৯২৬ সালে দেবীদ্বারের ঐতিহ্যবাহী এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সুজাত আলী। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, সাহসী ও নেতৃত্বগুণে উজ্জ্বল। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং সেখান থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের গুণাবলি তার মধ্যে বিকশিত হতে শুরু করে।
দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৪৩ সালে তিনি রয়েল ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সে যোগ দেন। পরে রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মি এবং দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সামরিক জীবনে দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের জন্য তিনি বিভিন্ন সম্মাননা ও স্বীকৃতি লাভ করেন। তবে তার প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে দেশের মানুষের জন্য কাজ করার মধ্য দিয়ে।
ষাটের দশকের শেষ দিকে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করেন। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে নবীন রাষ্ট্রের পুনর্গঠন ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও ক্যাপ্টেন সুজাত আলীর অবদান অত্যন্ত গৌরবময়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সক্রিয়ভাবে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পালাতানা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধের কঠিন সময়ে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং তাদের মনোবল দৃঢ় রাখার ক্ষেত্রে তার অবদান ছিল অসামান্য।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি চান্দিনা অঞ্চলে সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ও যুব শিবিরে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে মুক্তিযুদ্ধকে আরও বেগবান করেন। স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের নেতৃত্বও দেন তিনি। তার সাহসিকতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও দেশপ্রেম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে।
রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তারেও ছিল তার অসামান্য অবদান। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে শিক্ষার বিকল্প নেই। সেই চিন্তা থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন দেবীদ্বার এস.এ. সরকারি কলেজ। তার দূরদর্শী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ হাজারো শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে। দেবীদ্বারসহ আশপাশের অঞ্চলের অসংখ্য শিক্ষার্থী এই কলেজ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
জনসেবাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করা এই মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা, মানবিক ও জনবান্ধব। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো এবং এলাকার উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করার জন্য তিনি সর্বস্তরের মানুষের কাছে ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়।
দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে ২০০৭ সালের এপ্রিলে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডালাস শহরে ৮১ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। পরে তার মরদেহ দেশে এনে তারই প্রতিষ্ঠিত দেবীদ্বার এস.এ. সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর পরও তিনি বেঁচে আছেন তার কর্ম, আদর্শ এবং অবদানের মধ্য দিয়ে।
ক্যাপ্টেন (অব.) সুজাত আলী ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার জীবনগাথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জনসেবা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং শিক্ষা বিস্তারের এক অনন্য সমন্বয়। এলাহাবাদ ইউনিয়নের এই কৃতি সন্তান শুধু দেবিদ্বার বা কুমিল্লার গর্ব নন, তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসেরও এক উজ্জ্বল অধ্যায়। নতুন প্রজন্মের কাছে তার জীবন ও কর্ম দেশপ্রেম, সততা এবং জনকল্যাণে আত্মনিয়োগের এক অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবে।

