
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধি ঘিরে নতুন বিতর্ক: অর্থ পাচার, রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে সেই বিশ্ববাটপার ইউনূস সরকার
সময় যতই গড়াচ্ছে, বিশ্ববাটপার ইউনূস সরকারের দেড় বছরের অপকর্মের ফিরিস্তি ততই লম্বা হচ্ছে। শান্তিতে কথিত নোবেলজয়ী টাউট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেড় বছরের শাসনকাল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই দেড় বছরে শুধু দেশের অর্থনীতি নয়, আইনশৃঙ্খলা, সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশের জনগণ।
অর্থ পাচারেও ইউনূস সরকারের রেকর্ড দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারেও ইউনূস ও তাঁর সহযোগীরা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর গত বছরই (২০২৫ সাল) বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে সুইস ব্যাংকগুলোতে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে বলে বিশ্ববাটপার ইউনূস সরকার প্রচার করে আসছিলো। এ অর্থ পাচার নিয়ে তদন্তে একটি শ্বেতপত্র কমিটি গঠিত হয়েছিল অবৈথ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে আরেক অবৈথ প্রধানমন্ত্রী তারেক বলেন, ‘২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা)। সুইস ব্যাংকে জমা টাকার ভিত্তিতে হিসাব করলে দেখা যায়, ইউনূস আমলে আওয়ামী লীগের গড় বার্ষিক পাচারের চেয়ে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি পাচার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একাধিক ভাষণে বলেছেন, আর অর্থ পাচার হবে না। তিনি পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথাও বলেছেন। পাচারের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা বর্তমান সরকারের অন্যতম নির্বাচনি অঙ্গীকার।
এবারের বাজেটে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সুইস ব্যাংকের তথ্য আমাদের সামনে নতুন প্রশ্ন এনেছে। ইউনূস আমলে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে কী ব্যবস্থা নেবে বর্তমান সরকার? নাকি তাদের পাচারের বিষয়টি উপেক্ষা করা হবে?
বিশ্ব টাউট মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতিকে অর্থ পাচার রোধের বাণী শোনান। তিনি নিজের প্রচারের জন্য বিভিন্ন দেশ সফর করে অর্থ পাচার নিয়ে কথা বলেন বটে কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ইউনূস বলেছিলেন, খুব দ্রুত পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা হবে। কিন্তু ইউনূসের এ আশ্বাসও ছিল স্রেফ ফাঁকা বুলি।
ইউনূসের চেয়েও এক কাঠি সরেস ছিল তাঁর নিযুক্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। যিনি পাচার হওয়া অর্থ ছয় মাসের মধ্যে ফেরত আনার গল্প শুনিয়েছিলেন। রাষ্ট্রের টাকায় বিভিন্ন দেশ সফর করেন পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার কথা বলে। কিন্তু বেলা শেষে তিনি বলেন, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
বাস্তবে তাঁর বিরুদ্ধেই অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। গভর্নর থাকাকালেই তিনি দুবাইয়ে তাঁর মেয়ের নামে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন। এটা যে অর্থ পাচারের মাধ্যমে কেনা হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। কারণ আহসান এইচ মনসুর বা তাঁর মেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে দুবাইয়ে ফ্ল্যাট কেনার টাকা নিয়ে যাননি।
শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নন, অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর দুর্নীতি দমন কমিশনে ইউনূস সরকারের বেশির ভাগ উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আদিলুর রহমান খান, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ দু-একজন ছাড়া সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ এখন ওপেন সিক্রেট। বিশেষ করে সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং আসিফ মাহমুদ কেন সুইজারল্যান্ড সফর করেছিলেন সে প্রশ্ন এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামসহ ’২৪-এর আন্দোলনে জড়িত অনেকেই ইউনূস সরকারের সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করেছেন।
বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম আলোচিত ও উদ্বেগজনক বিষয়। বিভিন্ন সময়ে সরকার, রাজনৈতিক দল, অর্থনীতিবিদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ বিষয়ে নানা তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে তথ্য উঠে আসার পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এ তথ্যকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও তর্ক-বিতর্ক তীব্র হয়েছে। একদিকে কেউ কেউ বলছেন, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধি অর্থ পাচারের আশঙ্কাকে আরও জোরালো করছে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, সুইস ব্যাংকে জমা অর্থের সবটুকুই অবৈধ অর্থ নয়; এর মধ্যে বৈধ ব্যবসায়িক আমানত, প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব এবং বিভিন্ন ধরনের আর্থিক লেনদেনও থাকতে পারে। ফলে বিষয়টি গভীর তদন্ত ও বিশ্লেষণ ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা ৮৩৪.১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ।
অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি সুইস ফ্রাঁর মূল্য ১৫২ থেকে ১৫৩ টাকার মধ্যে। সে হিসেবে ২০২৫ সালের শেষে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের মোট জমার পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকার সমপরিমাণ।
এসএনবির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর ২০২৫ সালেই বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ সুইস ব্যাংকে জমা হয়েছে। গত এক দশকের হিসাবেও এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থান।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ৮৭১.১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছেছিল, যা ছিল সর্বোচ্চ। পরবর্তী দুই বছর কিছুটা কমলেও ২০২৪ সালে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায় এবং ২০২৫ সালে তা আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
এসএনবির প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আমানতের একটি তুলনামূলক চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ৩.২ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ আমানত নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ভারত। যদিও আগের বছরের তুলনায় ভারতীয় আমানত প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ৮৩৪.২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে এ কারণে যে, ভারতের আমানত কমলেও বাংলাদেশের আমানত এক বছরে ৪১ শতাংশ বেড়েছে।
অর্থ পাচার নিয়ে কাজ করা গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, সুইস ব্যাংকের পরিসংখ্যান দিয়ে পুরো চিত্র বোঝা সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের একটি ক্ষুদ্র অংশই সুইজারল্যান্ডে যায় বলে বিভিন্ন সময়ে ধারণা করা হয়েছে।
বিভিন্ন গবেষণা, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রবাহের তথ্য এবং আলোচিত অর্থ পাচারের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ যায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কেম্যান আইল্যান্ড এবং ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের মতো দেশে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, সুইস ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণ বাড়লে তা বৃহত্তর অর্থ পাচার প্রবণতার একটি ইঙ্গিত হতে পারে। তবে শুধুমাত্র সুইস ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে মোট অর্থ পাচারের পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কারণ এ ধরনের হিসাবের জন্য একাধিক আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রের তথ্য প্রয়োজন।
সুইস ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একটি পক্ষ দাবি করছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে অর্থ পাচার কমার পরিবর্তে আরও বেড়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল অর্থ পাচার বন্ধ করা এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা।
সমালোচকদের অভিযোগ, বাস্তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে দৃশ্যমান কোনো সাফল্য পাওয়া যায়নি। বরং সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধির তথ্য নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে সরকারের সমর্থকরা বলছেন, সুইস ব্যাংকে জমা অর্থের বৃদ্ধি মানেই নতুন করে অর্থ পাচার হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সঠিক নয়। কারণ এসব হিসাবে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
বাংলাদেশে অর্থ পাচার ইস্যু নতুন নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি অর্থ পাচার নিয়ে বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করে।
ওই কমিটির তথ্য উদ্ধৃত করে রাজনৈতিক নেতারা বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন যে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে গেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিবছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়।
তবে এই পরিসংখ্যান নিয়েও বিভিন্ন মহলে বিতর্ক রয়েছে। কারণ অর্থ পাচারের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ অত্যন্ত জটিল এবং ব্যবহৃত পদ্ধতির ওপর ফলাফল নির্ভর করে।
অর্থ পাচার বন্ধ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার অংশ।
বিভিন্ন সময় সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বিদেশে থাকা অবৈধ অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা একটি দীর্ঘমেয়াদি, ব্যয়বহুল এবং আইনি জটিলতায় পরিপূর্ণ প্রক্রিয়া। এজন্য বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক আদালত, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থ পাচার প্রতিরোধের চেয়ে পাচার হয়ে যাওয়ার পর তা ফিরিয়ে আনা অনেক বেশি কঠিন।
অর্থ পাচার বিতর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। সমালোচকরা দাবি করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
কিছু রাজনৈতিক মহল বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগও উত্থাপন করেছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোর বিষয়ে এখনো কোনো বিচারিক বা স্বাধীন তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।
অভিযোগকারীদের মতে, অর্থ পাচার প্রতিরোধে শুধু বক্তব্য নয়, কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অথবা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের আহ্বান জানিয়েছেন।
অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের বিশ্ববাটপার ইউনূসসহ তার কথিত সরকারের সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল থেকে উত্থাপিত হয়েছে।
সমালোচকদের দাবি, সরকারে দায়িত্ব পালনকারী কিছু ব্যক্তির সম্পদ, বিদেশ সফর এবং আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টার বিদেশ সফর এবং আর্থিক লেনদেন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা হয়েছে।
তবে অভিযোগ উত্থাপিত হলেও এসব বিষয়ে কতগুলো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কিংবা তদন্তের কোন পর্যায়ে রয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট সরকারি তথ্য অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশিত হয়নি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অর্থ পাচার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকাকালে নিজেদের অবস্থানকে দুর্নীতিবিরোধী হিসেবে তুলে ধরে এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ আনে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থ পাচার ইস্যুকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে হলে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। কারণ অর্থ পাচার একটি অর্থনৈতিক অপরাধ, যা শেষ পর্যন্ত পুরো দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
কিছু ব্যবসায়ী সংগঠন এবং অর্থনীতিবিদ অতীতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, তদন্তের নামে বৈধ ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে হয়রানি করা হলে বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাদের মতে, অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে, তবে তা হতে হবে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক এবং আইনের শাসনের আলোকে।
অন্যথায় প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যেতে পারে, আর বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অযথা চাপের মুখে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থ পাচার রোধে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, আর্থিক গোয়েন্দা নজরদারি শক্তিশালী করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে।
পঞ্চমত, বিদেশে সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে বৈধ ও অবৈধ অর্থের পার্থক্য নির্ণয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থাকে কাজে লাগাতে হবে।
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বৃদ্ধির সর্বশেষ তথ্য আবারও অর্থ পাচার ইস্যুকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এই তথ্যকে ঘিরে রাজনৈতিক অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং নানা প্রশ্ন তৈরি হলেও একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত—অর্থ পাচার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে কোনো ব্যক্তি, সরকার বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্য-প্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। অর্থ পাচারকারীর রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, আইন সমভাবে প্রয়োগ করা হলে তবেই জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবে।