দেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত কুমিল্লায় বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে। এ দাবিকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ (হাজী ইয়াসিন) গত ২১ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ চৌধুরীর কাছে একটি আধা-সরকারি (ডিও) পত্র পাঠিয়েছেন।
কুমিল্লাভিত্তিক সামাজিক সংগঠন ‘নাগরিক অধিকার ফোরাম’-এর দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষাপটে পাঠানো ওই চিঠিতে কুমিল্লার অর্থনৈতিক গুরুত্ব, ভৌগোলিক অবস্থান এবং বৃহত্তর অঞ্চলের ব্যাংকিং কার্যক্রমের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
চিঠিতে মন্ত্রী উল্লেখ করেন, কুমিল্লা বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন, ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা। বর্তমানে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী—এই ছয়টি জেলার সমন্বয়ে কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। জনসংখ্যা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি উৎপাদন, শিক্ষা, প্রবাসী আয়, শিল্পায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের বিচারে এ অঞ্চল জাতীয় অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ দিক
- কুমিল্লায় বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের দাবি জোরালো হয়েছে।
- মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ (হাজী ইয়াসিন) অর্থমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার পাঠিয়েছেন।
- চিঠিতে কুমিল্লার অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
- কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী নিয়ে গঠিত অঞ্চলের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো আঞ্চলিক কার্যালয় নেই।
- ব্যবসায়ী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখনো ঢাকা ও চট্টগ্রামের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
- আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপিত হলে ব্যাংকিং সেবা, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও বিনিয়োগ কার্যক্রম সহজ হবে।
- নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আঞ্চলিক অর্থনীতির উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
- নাগরিক অধিকার ফোরাম ও স্থানীয় সাংবাদিক নেতারা উদ্যোগটিকে সময়োপযোগী ও যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন।
- কুমিল্লায় শাখা স্থাপিত হলে এটি হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১১তম আঞ্চলিক কার্যালয়।
- সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি দেশের অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে।
কিন্তু এত বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থাকা সত্ত্বেও বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো আঞ্চলিক কার্যালয় নেই। ফলে স্থানীয় ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, শিল্প উদ্যোক্তা, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবা গ্রহণের জন্য ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের শাখার ওপর নির্ভর করতে হয়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত জটিলতা, এলসি অনুমোদন, আর্থিক নীতিমালা সংক্রান্ত পরামর্শ, তদারকি কার্যক্রম এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদেরকে বারবার ঢাকা ও চট্টগ্রামে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, কুমিল্লায় বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি আঞ্চলিক কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু কুমিল্লাই নয়, পুরো দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ব্যাংকিং কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন সেবা স্থানীয় পর্যায়ে সহজলভ্য হবে। শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে গতি আসবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে।
এ বিষয়ে নাগরিক অধিকার ফোরামের নেতারা বলেন, কুমিল্লা বর্তমানে দেশের অন্যতম রেমিট্যান্সসমৃদ্ধ অঞ্চল। বিপুল সংখ্যক প্রবাসী এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন। একইসঙ্গে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং আমদানি-রপ্তানি খাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি আঞ্চলিক কার্যালয় প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি।
উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়ে দৈনিক আজকের কথা পত্রিকার সাবেক সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক খাদিজা বেগম বলেন, “কুমিল্লায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন কেবল একটি প্রশাসনিক দাবি নয়, এটি এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। কুমিল্লার ব্যবসা-বাণিজ্য, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং আর্থিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বিবেচনায় এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি উপস্থিতি প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, “মন্ত্রী হাজী ইয়াসিনের এই উদ্যোগ সময়োপযোগী। সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলে বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ভিত্তি লাভ করবে।”
নাগরিক অধিকার ফোরাম কুমিল্লার সাধারণ সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহজাদা এমরানও এ উদ্যোগের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলেন, “কুমিল্লা এবং আশপাশের জেলার কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এটি। ব্যাংকিং খাতের বিস্তৃতি, গ্রাহক সংখ্যা, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের দিক থেকে কুমিল্লা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। তাই এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন পুরোপুরি যৌক্তিক।”
তিনি মন্ত্রী হাজী ইয়াসিনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “জনগণের দীর্ঘদিনের একটি দাবি সরকারিভাবে উত্থাপন করায় আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ। আশা করছি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।”
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কুমিল্লায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপিত হলে ব্যাংকিং তদারকি জোরদার হবে, আর্থিক সেবার মান উন্নত হবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে স্থানীয় ব্যাংকগুলোর যোগাযোগ আরও কার্যকর হবে। একইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বিনিয়োগ কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ঢাকার মতিঝিলে অবস্থিত। এছাড়া চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, বগুড়া, ময়মনসিংহ এবং সদরঘাটসহ দেশে মোট ১০টি শাখা কার্যালয় রয়েছে। কুমিল্লায় নতুন আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপিত হলে সেটি হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১১তম আঞ্চলিক শাখা, যা দেশের আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী, সম্পাদক :