দেশের অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা ফরিদপুরে এবার অর্ধেক দামে পেঁয়াজ বেচাবিক্রি নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় লাভ তো দূরের কথা, মূলধন ফেরত পাওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে জেলার হাজার হাজার পেঁয়াজচাষী গভীর হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
প্রতিবেদনের মূল বিষয়
- ফরিদপুরে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হলেও উৎপাদন খরচ প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা।
- লাভ তো দূরের কথা, অনেক কৃষক মূলধন তুলতেও হিমশিম খাচ্ছেন।
- সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় লোকসান আরও বাড়ছে।
- সংরক্ষণাগার ও হিমাগারের অভাবে কৃষকদের বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে।
- কৃষকদের আশঙ্কা, ন্যায্যমূল্য না পেলে আগামী মৌসুমে অনেকেই পেঁয়াজ চাষ থেকে সরে দাঁড়াবেন।
- কৃষি বিভাগ জানায়, পেঁয়াজ সংরক্ষণে এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণসহ বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
- স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে পেঁয়াজ ক্রয় ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হলেও কৃষকদের দাবি, এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে তাদের খরচ পড়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা। ফলে প্রতি মণেই গুনতে হচ্ছে বড় ধরনের লোকসান।
কৃষকদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, ডিজেল ও শ্রমিকের মজুরি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তারা আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বাজারে মাছ, মাংস, ডিম ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের দাম বাড়লেও পেঁয়াজের দাম দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী থাকায় চাষিদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার পেঁয়াজচাষী আহম্মদ মাতুব্বর বলেন, “এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করতে এখন বিপুল খরচ হয়। বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিকের খরচ যোগ করলে যে বিনিয়োগ করতে হয়, সেই তুলনায় বর্তমান বাজারদর অত্যন্ত হতাশাজনক। এখন এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এক কেজি গরুর মাংসও কেনা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকদের পক্ষে চাষাবাদ ধরে রাখা সম্ভব হবে না।”
একই উপজেলার পাইকারি ক্রেতা সুজন মাতুব্বর বলেন, “পেঁয়াজের দাম কমে যাওয়ায় শুধু কৃষকরাই নয়, ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কম দামে কিনলেও অন্যান্য বাজারে কাঙ্ক্ষিত দামে বিক্রি করা যাচ্ছে না। দাম কিছুটা বাড়লে কৃষক ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষই উপকৃত হতো।”
বোয়ালমারী উপজেলার কৃষক বক্কার মোল্যা বলেন, “একটি ফসল উৎপাদনে যে পরিমাণ পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হয়, বর্তমান বাজারদর তার সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বছরের পর বছর লোকসান হলে কৃষকরা একসময় পেঁয়াজ চাষ থেকে সরে দাঁড়াবে। তখন দেশে আবার পেঁয়াজ সংকট দেখা দিতে পারে।”
নগরকান্দা উপজেলার কৃষক কবির শেখ বলেন, “আমাদের এলাকায় পর্যাপ্ত হিমাগার বা আধুনিক সংরক্ষণাগার নেই। ফলে পেঁয়াজ দীর্ঘদিন মজুত রাখার সুযোগও নেই। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে ভালো দামের অপেক্ষা করা যেত।”
ভাঙ্গা উপজেলার কৃষক হামজা মোল্যা বলেন, “বর্তমান বাজারদরে শ্রমিকের খরচও ওঠে না। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে পেঁয়াজ চাষ করেছেন। এখন তারা ব্যাংক ও এনজিওর কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকরা।”
ফরিদপুর শহরের পাইকারি পেঁয়াজ ব্যবসায়ী শাহজাহান বেপারি বলেন, “এ বছর পেঁয়াজের উৎপাদন ভালো হয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও বাজারে প্রচুর পেঁয়াজ সরবরাহ হচ্ছে। ফলে বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে গেছে। তবে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বাজার ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়া এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে প্রায় প্রতি বছরই পেঁয়াজের বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যায়। দাম বেড়ে গেলে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর দাম কমে গেলে লোকসানের বোঝা বইতে হয় কৃষকদের।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, “ফরিদপুরে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয় এবং কৃষকরা ভালো ফলনও পান। তবে বাজারমূল্য নির্ধারণ কৃষি বিভাগের দায়িত্ব নয়। আমরা কৃষকদের উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে থাকি।”
তিনি জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকদের সহায়তা দিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালে ইতোমধ্যে ৭০০টি মেশিন বিতরণ করা হয়েছে এবং বছরজুড়ে আরও ২ হাজার ৫০০টি এয়ারফ্লো মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকরা তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প আরও সম্প্রসারণ করা হলে কৃষকরা উপকৃত হবেন।”
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফরিদপুরের সালথা, নগরকান্দা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, সদরপুর ও মধুখালী উপজেলায় ব্যাপক পরিসরে পেঁয়াজের আবাদ হয়। জেলার হাজার হাজার পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই ফসলের ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, অর্ধেক দামে পেঁয়াজ আর নয়, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে পেঁয়াজ ক্রয়, আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ, বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকলেও লাভের মুখ না দেখায় কৃষকদের পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ কমে যাবে।
একদিকে উৎপাদন খরচের লাগামহীন বৃদ্ধি, অন্যদিকে বাজারে মূল্যপতন—এই দ্বিমুখী সংকটে ফরিদপুরের পেঁয়াজচাষীরা এখন দিশেহারা। কৃষকের ঘামঝরা শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত না হলে শুধু কৃষক নয়, দেশের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি :