জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কুড়িগ্রামে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। জেলার মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীদের বাদ দিয়ে বাছাইকৃত কয়েকজনকে নিয়ে অবহিতকরণ সভা ও প্রেস কনফারেন্স আয়োজনের অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় জেলার জাতীয় ও মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
আগামী ২৮ জুন অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন-২০২৬ (প্রথম রাউন্ড) উপলক্ষে বুধবার কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ে একটি অবহিতকরণ সভা এবং পরবর্তীতে প্রেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, জেলার অধিকাংশ জাতীয়, আঞ্চলিক ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। বরং সীমিত পরিসরে পছন্দের কিছু ব্যক্তিকে নিয়ে দায়সারাভাবে কর্মসূচি সম্পন্ন করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের ভাষ্য, জনসচেতনতা তৈরির সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম গণমাধ্যম। শিশুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি সংশ্লিষ্ট এমন একটি জাতীয় কর্মসূচিতে মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে উপেক্ষা করা শুধু দায়িত্বহীনতার পরিচয় নয়, বরং জনস্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ বলেও মনে করছেন তারা।
জাতীয় দৈনিক কালবেলা’র কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি এবং ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য এশিয়ান এজ’-এর রংপুর ব্যুরো প্রধান সিনিয়র সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, বর্তমানে শিশুদের হাম প্রতিরোধ ও শিশু মৃত্যুহার কমাতে সরকার নানা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন সেই উদ্যোগগুলোর অন্যতম। তিনি বলেন, “এ ধরনের কর্মসূচির গুরুত্ব জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে মূলধারার গণমাধ্যমের কোনো বিকল্প নেই। অথচ সিভিল সার্জন পরিকল্পিতভাবে তার পছন্দের কয়েকজনকে নিয়ে দায়সারাভাবে অবহিতকরণ সভা ও প্রেস কনফারেন্স সম্পন্ন করেছেন। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন স্বজনপ্রীতিমূলক আচরণ কাম্য নয়।”
দৈনিক আজকালের খবর-এর জেলা প্রতিনিধি ও সিনিয়র সাংবাদিক এম এ আযমও সিভিল সার্জনের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানান।
ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশন ও দৈনিক আগামীর সময়-এর কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি তামজিদ হাসান তুরাগ বলেন, “জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। এর প্রচার ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে মূলধারার মিডিয়ার ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে সাংবাদিকদের একটি বড় অংশকে বাদ দিয়ে প্রেস কনফারেন্স আয়োজন করা হয়েছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং দুঃখজনক।”
দৈনিক আমার দেশ-এর কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ আল মুজাহিদ বলেন, “যার কাছে মূলধারার গণমাধ্যমের গুরুত্ব নেই, তার কাছে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব কতটুকু তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। জনগণকে সচেতন করার প্রধান মাধ্যমকে উপেক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।”
কুড়িগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য সচিব ও এটিএন নিউজ প্রতিনিধি মনোয়ার হোসেন লিটন বলেন, “জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে জেলার বৃহত্তম সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ না জানানো অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে মূলধারার সাংবাদিকদের ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।”
ইউনাইটেড প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক ও চ্যানেল ওয়ানের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি রাশিদুল ইসলাম বলেন, “সিভিল সার্জন দীর্ঘদিন ধরেই জেলার মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি থেকে দূরে রাখছেন। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন আচরণ সরকারের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। সাংবাদিকদের প্রতি এই বৈষম্যমূলক মনোভাব দীর্ঘদিনের।”
সাংবাদিকদের অভিযোগ, কুড়িগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক যোগাযোগের ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত না করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও পক্ষপাতমূলক পন্থা অনুসরণ করায় সরকারের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত প্রচার ও জনসম্পৃক্ততা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে জেলার সাংবাদিক মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে মূলধারার গণমাধ্যমকে বাদ দেওয়া শুধু প্রশাসনিক উদাসীনতাই নয়, বরং তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের একটি অস্বচ্ছ প্রবণতারও ইঙ্গিত বহন করে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার চৌধুরী বলেন, “আমি মূলধারার সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানাতে বলেছিলাম। কিন্তু অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টাফরা তা করেনি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। ভবিষ্যতে যাতে কোনো মূলধারার সাংবাদিক এ ধরনের কর্মসূচি থেকে বাদ না পড়েন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, আগামী ২৮ জুন সারাদেশের মতো কুড়িগ্রামেও জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন-২০২৬ (প্রথম রাউন্ড) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ কর্মসূচি সফল করতে গণমাধ্যমের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা অপরিহার্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আজকের কথা ডেস্ক