প্রিন্ট এর তারিখঃ বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩

সুন্দরগঞ্জে তিস্তার ভয়াবহ ভাঙন, এক সপ্তাহে নদীগর্ভে বিলীন ৫ শতাধিক বসতভিটা

তিস্তা নদীর অব্যাহত ভাঙনে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকায় বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
জাহিদ হাসান জীবন, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) থেকে :

ভাঙনে নিঃস্ব শত শত পরিবার

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে এক সপ্তাহের ব্যবধানে অন্তত
৫ শতাধিক বসতভিটা, শত শত একর ফসলি জমি, গ্রামীণ সড়ক এবং অসংখ্য গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
ভাঙন অব্যাহত থাকায় আরও বিস্তীর্ণ জনপদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি ও তিস্তার ডান তীরের পুরোনো বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে।
সর্বস্ব হারিয়ে বহু পরিবার খোলা আকাশের নিচে, সড়কের পাশে কিংবা অন্যের জমিতে অস্থায়ী আশ্রয় নিয়ে
মানবেতর জীবনযাপন করছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বেলকা, হরিপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং তারাপুর, দহবন্দ, শান্তিরাম, কঞ্চিবাড়ি, শ্রীপুর, চণ্ডিপুর ইউনিয়ন ও পৌরসভার একাংশ বর্তমানে নদীভাঙনের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভাটিতে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের মিলনস্থল হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে এ অঞ্চলে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক উজানের পাহাড়ি ঢল এবং নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাপাসিয়া ইউনিয়নের উত্তর লালচামার, ভোরের পাখি, উজান বুড়াইল, কেরানীরচর ও ভাটি বুড়াইল এলাকা। নদীর তীব্র স্রোতে মুহূর্তের মধ্যে বসতভিটা, কৃষিজমি, গাছপালা ও বাঁশঝাড় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র কিংবা গবাদিপশু সরিয়ে নেওয়ারও সময় পাচ্ছে না।

প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ দিক

  • এক সপ্তাহে তিস্তা নদীর ভাঙনে অন্তত ৫ শতাধিক বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
  • শত শত একর কৃষিজমি, গ্রামীণ সড়ক ও অসংখ্য গাছপালা ভাঙনের কবলে পড়েছে।
  • কাপাসিয়া, বেলকা, হরিপুরসহ কয়েকটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
  • অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ না পেয়েই সর্বস্ব হারিয়েছে।
  • ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত এবং সরকারি সহায়তার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
  • স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন নদীভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা।

ক্ষতিগ্রস্ত আবুল হোসেন, রবিউল ইসলাম, শাহ কামাল, জাহাঙ্গীর, জাফর আলী, জয়নাল আবেদীন ও মমিনুল ইসলামসহ স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছরই নদী তাদের ঘরবাড়ি ও জমিজমা গ্রাস করছে। কিন্তু স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় তারা বারবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। এবারও পরিবার নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন এবং কীভাবে নতুন করে জীবন শুরু করবেন, সেই অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেললেও তা ভাঙনের ভয়াবহতার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মঞ্জু মিয়া এবং ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম ও হাবিজার রহমান জানান, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা দ্রুত প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে সরকারি সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া যায়।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থায়ী নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফ্ফাত জাহান তুলি বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুতের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে বিশেষ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া মাত্র ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তা বিতরণ করা হবে।

বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই তিস্তার ভয়াবহ ভাঙন সুন্দরগঞ্জের নদীতীরবর্তী জনপদে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছরের অস্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নয়, দ্রুত টেকসই নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদীভাঙনকবলিত মানুষের জীবন, বসতভিটা ও কৃষিজমি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রিন্ট করুন