
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জোয়ারে নেই পাঠক, আছে শুধু ঘরের ঘরে লেখক। একসময় বলা হতো, ‘ভালো বই মানুষকে সমৃদ্ধ করে, চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে।’ কিন্তু ডিজিটাল যুগে এসে সেই চিত্র যেন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন বই পড়ার চেয়ে বই লেখা, প্রকাশ করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে লেখক হিসেবে পরিচিত করে তোলার প্রবণতা বেড়েছে বহুগুণ। ফলে সাহিত্যাঙ্গনে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে—দেশে প্রকৃত পাঠকের তুলনায় লেখকের সংখ্যাই যেন বেশি।
প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার এবং তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রবণতা লেখালেখিকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। আগে একটি লেখা প্রকাশের জন্য পত্রিকা, সাময়িকী কিংবা প্রকাশকের দ্বারস্থ হতে হতো। এখন একটি ফেসবুক পোস্ট, ব্লগ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মেই মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে লেখা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সুযোগ ইতিবাচক হলেও এর একটি নেতিবাচক দিকও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। লেখকের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না পাঠকের সংখ্যা। বরং অনেকেই নিজের লেখা প্রচারে যতটা আগ্রহী, অন্যের লেখা পড়তে ততটাই অনাগ্রহী।
ফেসবুকে লেখকের ভিড়, পাঠকের সংকট
বর্তমানে ফেসবুক, ব্লগ ও বিভিন্ন সাহিত্যভিত্তিক গ্রুপে প্রতিদিন হাজার হাজার কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা ও মতামত প্রকাশিত হচ্ছে। লাইক, কমেন্ট ও শেয়ারের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়ার কারণে অনেকেই নিয়মিত লেখালেখিতে যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু সাহিত্যবোদ্ধাদের মতে, এই লেখকদের বড় একটি অংশের মধ্যে নিয়মিত পাঠাভ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্বসাহিত্য, বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক কিংবা সমসাময়িক মানসম্মত সাহিত্য সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়াই অনেকেই বই প্রকাশের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে লেখার গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বইমেলায় বই বাড়ছে, বাড়ছে না পাঠক
সাম্প্রতিক কয়েক বছরের অমর একুশে বইমেলার চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবছর হাজার হাজার নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে। নতুন লেখকের সংখ্যাও বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইয়ের প্রচারণা, মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা অনুষ্ঠান ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেলেও প্রকৃত পাঠক ও ক্রেতার সংখ্যা সেই হারে বাড়ছে না।
প্রকাশনা সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, মেলায় আগত অনেক দর্শনার্থী বই কেনার চেয়ে ছবি তোলা, ভিডিও তৈরি কিংবা নিজের প্রকাশিত বইয়ের প্রচারণাতেই বেশি সময় ব্যয় করেন। ফলে বিপুলসংখ্যক বই প্রকাশ পেলেও অধিকাংশ বইয়ের বিক্রি প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায় না।
উদ্বেগ প্রকাশ করলেন সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী
বর্তমান পরিস্থিতিকে সাহিত্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী।
তিনি বলেন,
“একজন ভালো লেখক হওয়ার আগে অবশ্যই একজন ভালো পাঠক হতে হবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেকেই পর্যাপ্ত পড়াশোনা ছাড়াই লেখক হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইক-কমেন্ট সাময়িক জনপ্রিয়তা এনে দিতে পারে, কিন্তু তা কখনো স্থায়ী সাহিত্যিক মূল্য তৈরি করতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন,
“গবেষণা, অধ্যয়ন ও গভীর চিন্তার বিকল্প নেই। নিয়মিত পাঠাভ্যাস ছাড়া মানসম্মত সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব নয়। বর্তমানে মানহীন লেখার সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে প্রকৃত মেধাবী লেখকদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মকে লেখার আগে বেশি করে পড়তে হবে।”
এবিএম আতিকুর রহমান বাশারের মতে, সাহিত্য কেবল আবেগ প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি সমাজের চিন্তা, ইতিহাস, দর্শন ও সংস্কৃতির ধারক। তাই লেখকের দায়িত্বও অনেক বড়।
আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষা নাকি সাহিত্যচর্চা?
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে আত্মপ্রকাশের প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। সবাই নিজের ভাবনা অন্যকে জানাতে আগ্রহী হলেও অন্যের ভাবনা গ্রহণ করার মানসিকতা তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে।
এর ফলে পাঠাভ্যাসের পরিবর্তে আত্মপ্রকাশই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সম্পাদনা ছাড়াই বই প্রকাশিত হচ্ছে। বানান ভুল, ভাষাগত দুর্বলতা, তথ্যগত অসংগতি এবং বিষয়বস্তুর গভীরতার অভাবও বাড়ছে।
প্রকাশনা শিল্পের জন্যও এটি একটি সতর্কবার্তা
সাহিত্য সমালোচকদের মতে, মানহীন বইয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকলে পাঠকের আস্থা কমে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রকাশনা শিল্পের জন্যও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। একই সঙ্গে লেখকদেরও গবেষণা, অধ্যয়ন এবং নিয়মিত পাঠচর্চার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
উত্তরণের পথ
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকট কাটিয়ে উঠতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি—
- নতুন লেখকদের নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
- প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে মানসম্পন্ন পাণ্ডুলিপি নির্বাচনে কঠোর হতে হবে।
- সাহিত্য সংগঠনগুলোকে পাঠচক্র ও বইপাঠ আন্দোলন জোরদার করতে হবে।
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেবল লেখার প্রচারণা নয়, ভালো বই পড়ার সংস্কৃতিও ছড়িয়ে দিতে হবে।
সাহিত্যবোদ্ধাদের ভাষ্য, একটি সুস্থ সাহিত্যচর্চার জন্য লেখক যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নিবেদিত পাঠক। পাঠক ছাড়া সাহিত্য টিকে থাকতে পারে না। তাই দেশে যদি লেখকের সংখ্যা পাঠকের চেয়ে ক্রমাগত বাড়তেই থাকে, তবে ভবিষ্যতে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা বাড়লেও মননশীল সমাজ গঠনের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

