
চার দশকের বন্ধুত্বের গল্প: বাল্যবন্ধু আবু সুফিয়ান মল্লিক আজ সফল ব্যবসায়ী
বাল্যবন্ধু আবু সুফিয়ান মল্লিক আজ জীবনের পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। কিন্তু সময়ের দীর্ঘ ব্যবধানও আমাদের শৈশবের বন্ধুত্বকে এতটুকু ম্লান করতে পারেনি। মানুষের জীবনে এমন কিছু সম্পর্ক থাকে, যা বয়সের সঙ্গে পুরোনো হয় না; বরং সময়ের পরতে পরতে আরও গভীর, আরও মূল্যবান হয়ে ওঠে। শৈশবের বন্ধুত্ব ঠিক তেমনই এক নির্মল অনুভূতি—যেখানে নেই কোনো স্বার্থের হিসাব, নেই কোনো কৃত্রিমতা; আছে শুধু আন্তরিকতা, বিশ্বাস আর অগণিত স্মৃতির আলো। জীবনের ব্যস্ততা, কর্মজীবন, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা দূরত্ব আমাদের ভিন্ন পথে নিয়ে গেলেও কিছু মানুষ হৃদয়ের খুব কাছেই থেকে যান। আমার জীবনের তেমনই একজন প্রিয় মানুষ, আমার বাল্যবন্ধু আবু সুফিয়ান মল্লিক। তাঁর সঙ্গে কাটানো শৈশবের দিনগুলো আজও আমার স্মৃতির পাতায় ঠিক ততটাই উজ্জ্বল, যতটা ছিল প্রথম পরিচয়ের সেই নিষ্পাপ দিনগুলোতে।
বর্তমানে তার বয়স আনুমানিক ৪৭ থেকে ৪৯ বছর। তবে বয়সের হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান আমাদের সেই শৈশবের দিনগুলো, যেগুলো আজও মনে পড়লে হৃদয়টা আবেগে ভরে ওঠে। আমার সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় সম্ভবত ১৯৮৪ কিংবা ১৯৮৫ সালের দিকে। তখন আমরা দু’জনই ছোট্ট শিশু। আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার কাজিয়াতল দক্ষিণ পাড়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসায়, যা সে সময় এলাকাবাসীর কাছে কাজিয়াতল বড়বাড়ি মাদ্রাসা নামেই বেশি পরিচিত ছিল।
চার দশকের বন্ধুত্ব: কাজিয়াতল বড়বাড়ি মাদ্রাসার একই বেঞ্চে বসে শুরু হয়েছিল দুই বন্ধুর পথচলা। সময় বদলেছে, জীবন বদলেছে; কিন্তু আবু সুফিয়ান মল্লিক ও লেখকের সেই শৈশবের বন্ধুত্ব আজও অটুট। সফল ব্যবসায়ী হয়েও সুফিয়ান এলাকার মানুষের কাছে একজন ভদ্র, বিনয়ী ও পরোপকারী মানুষ হিসেবে পরিচিত।
সেই মাদ্রাসাতেই আমরা প্রথম শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত একসঙ্গে লেখাপড়া করেছি। একই বেঞ্চে বসা, একসঙ্গে ক্লাস করা, টিফিনের সময় মাঠে দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা আর দুরন্তপনায় ভরা অসংখ্য দিন আজও স্পষ্ট মনে আছে। শৈশবের সেই দিনগুলো ছিল নিষ্পাপ, নির্মল আর অফুরন্ত আনন্দে ভরা।
পরে পারিবারিক সিদ্ধান্তে আমরা দু’জনই কাজিয়াতল দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। মজার বিষয় হলো, সেখানে আবারও প্রথম শ্রেণি থেকেই পড়াশোনা শুরু করতে হয়েছিল। এরও আগে আমি ঢাকার আজিমপুর ছাপড়া মসজিদ সংলগ্ন একটি বিদ্যালয়ে কিছুদিন প্রথম শ্রেণিতে পড়েছিলাম। জীবনের নানা পরিবর্তনের মধ্যেও গ্রামের সেই বিদ্যালয় এবং সেখানে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বই সবচেয়ে গভীর ছাপ রেখে গেছে।
বন্ধু আবু সুফিয়ান মল্লিক আজ একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। দীর্ঘ পরিশ্রম, সততা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি সমাজে নিজের একটি সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করেছেন। জীবনের প্রতিটি ধাপ তিনি ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে অতিক্রম করেছেন। একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি যেমন পরিচিত, তেমনি একজন ভদ্র, বিনয়ী এবং পরোপকারী মানুষ হিসেবেও এলাকাবাসীর কাছে সমানভাবে শ্রদ্ধার পাত্র।
জীবনের আরেকটি বড় দায়িত্বও তিনি সফলভাবে পালন করেছেন। শুনেছি, তিনি তার বড় মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করেছেন। এছাড়া তার আরও দুই ছেলে রয়েছে, যারা এখন সাবালক এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। একজন বাবার জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে!
অন্যদিকে, আমার জীবনের পথ কিছুটা ভিন্ন। ব্যক্তিগত কারণে আমার বিয়ে হয়েছে অনেক দেরিতে। তাই সংসার জীবনের যে পর্যায়ে বন্ধু সুফিয়ান অনেক আগেই পৌঁছে গেছেন, আমি এখনো সেখানে পৌঁছাতে পারিনি। তবে এ নিয়ে কখনো আফসোস নয়; বরং বন্ধুর সাফল্য ও সুখের খবর শুনে নিজেরই ভালো লাগে। সত্যিকারের বন্ধুত্ব এমনই—বন্ধুর আনন্দে নিজের আনন্দ খুঁজে পাওয়া।
আবু সুফিয়ান মল্লিকের বাবা ছিলেন মরহুম হাজী আবদুল মালেক মল্লিক। তিনি ছিলেন একজন সম্মানিত ও সৎ মানুষ। তাদের পরিবারে পাঁচ ভাই ও দুই বোন। ভাইবোনদের মধ্যে সুফিয়ানই সবচেয়ে ছোট। পরিবারের সবার স্নেহ-ভালোবাসার মধ্যে বড় হলেও কখনো অহংকার তাকে স্পর্শ করেনি। ছোটবেলা থেকেই সে ছিল অত্যন্ত নম্র, শান্ত স্বভাবের এবং সবার প্রতি আন্তরিক।
আমাদের ছোটবেলার স্মৃতিগুলো এখনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। স্কুলে যাওয়া, বই-খাতা ভাগাভাগি করে পড়া, মাঠে খেলাধুলা, কখনো একসঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফেরা—এসব মুহূর্ত আজও হৃদয়ের গভীরে গেঁথে আছে। তখন জীবন ছিল অনেক সহজ। না ছিল মোবাইল ফোন, না ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ছিল শুধু আন্তরিক সম্পর্ক, বিশ্বাস আর নিখাদ বন্ধুত্ব।
জীবনের ব্যস্ততা আমাদের অনেক দূরে নিয়ে গেছে। আজ হয়তো আগের মতো প্রতিদিন দেখা হয় না, ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্পও হয় না। কিন্তু দেখা হলে মনে হয়, সময় যেন থেমে আছে সেই শৈশবেই। সম্পর্কের উষ্ণতায় কোনো ভাটা পড়েনি।
সুফিয়ানের সবচেয়ে বড় গুণ হলো, সে মানুষের উপকার করতে ভালোবাসে। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের পাশে দাঁড়ানো, মানুষের বিপদে সহযোগিতা করা এবং সবার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা তার স্বভাবের অংশ। ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি এই মানবিক গুণগুলোই তাকে আরও বড় মানুষ হিসেবে পরিচিত করেছে।
একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার সম্পদে নয়, তার চরিত্রে। আর সেই বিচারে আবু সুফিয়ান মল্লিক একজন সত্যিকারের ভালো মানুষ। সততা, ভদ্রতা, বিনয় ও মানবিকতা—এই চারটি গুণ তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
আজ যখন পেছন ফিরে প্রায় চার দশকেরও বেশি সময়ের স্মৃতির দিকে তাকাই, তখন মনে হয়—সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, জীবন বদলেছে; কিন্তু শৈশবের বন্ধুত্ব বদলায়নি। সেই বন্ধুত্ব এখনো হৃদয়ের গভীরে একইভাবে বেঁচে আছে।
আমার প্রিয় বাল্যবন্ধু আবু সুফিয়ান মল্লিকের জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা। মহান আল্লাহ তাআলা যেন তাকে সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, ব্যবসায় আরও সমৃদ্ধি এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখী ও শান্তিময় জীবন দান করেন। আমাদের শৈশবের সেই নির্মল বন্ধুত্ব যেন আজীবন অটুট থাকে—এই কামনাই করি।

