প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

“১৯ বছর বয়স, ১৯ নম্বর জার্সি, ১৯ জুলাই বিশ্বজয়—ইয়ামালের ভাগ্যের অবিশ্বাস্য মিল!”

স্পেনের নতুন ফুটবল তারকা লামিনে ইয়ামাল।
মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী, সম্পাদক :

১৯-এর মহাকাব্য! ১৯ বছর বয়সে বিশ্বজয়, ১৯ নম্বর জার্সিতে ইতিহাস—ফুটবলের নতুন রাজপুত্র লামিন ইয়ামাল

বিশ্বকাপ জিতে নতুন যুগের সূচনা, মেসির উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রে স্পেনের বিস্ময়বালক; মাঠের নায়ক হওয়ার পাশাপাশি ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে মানবিকতারও অনন্য দৃষ্টান্ত

ফুটবলের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত থাকে, একদিকে বিদায়ের বেদনায় অশ্রুসিক্ত কিংবদন্তি লিওনেল মেসি, অন্যদিকে মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জিতে ফুটবলের নতুন নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা স্পেনের বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল। যা কেবল একটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়—বরং একটি যুগের সমাপ্তি এবং নতুন যুগের সূচনার প্রতীক হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল ঠিক তেমনই একটি রাত।

অদ্ভুত এক কাকতালীয় মিল যেন ইতিহাসকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছে। ইয়ামালের বয়স ১৯ বছর, জার্সি নম্বর ১৯, আর বিশ্বকাপ জয়ের রাতও ১৯ জুলাই দিবাগত রাত। যেন সংখ্যাটিই তার ভাগ্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে আরেকটি দৃশ্য। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার উল্লাসে মেতে থাকা ইয়ামাল হঠাৎ সতীর্থদের ছেড়ে এগিয়ে যান লিওনেল মেসির দিকে। দু’জনের সেই আলিঙ্গন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। ফুটবলপ্রেমীদের অনেকেই এটিকে আখ্যা দিয়েছেন—“এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে ফুটবলের রাজদণ্ড হস্তান্তরের মুহূর্ত”।

মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আবেগঘন দৃশ্য

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে প্রায় ৮০ হাজার দর্শকের সামনে অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় লড়াই শেষে স্পেন ১-০ গোলে হারায় আর্জেন্টিনাকে।

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে স্পেনের খেলোয়াড়রা উল্লাসে মেতে ওঠেন। আর অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি। অনেকের ধারণা, এটিই ছিল বিশ্বমঞ্চে তার শেষ ম্যাচ।

কিন্তু সেই আবেগঘন মুহূর্তেই ইয়ামাল ছুটে যান নিজের শৈশবের আদর্শ মেসির কাছে। আলিঙ্গনে আবদ্ধ হন দুজন। কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

এই গল্পের শুরু ২০০৭ সালে

মেসি ও ইয়ামালের সম্পর্কের সূচনা অবশ্য বিশ্বকাপ ফাইনালে নয়। এর শুরু প্রায় দুই দশক আগে।

২০০৭ সালে ইউনিসেফের একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের ফটোশুটে অংশ নিয়েছিলেন তরুণ লিওনেল মেসি। সেই সময় লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত হয় ইয়ামালের পরিবার।

মাত্র পাঁচ মাস বয়সী শিশু ইয়ামালকে একটি নীল রঙের প্লাস্টিকের বাথটাবে গোসল করাতে সাহায্য করেছিলেন ২০ বছর বয়সী মেসি। পাশে ছিলেন ইয়ামালের মা শিলা এবানা।

সেই ছবিটি তখন হয়তো ছিল একটি সাধারণ ফটোশুট। কিন্তু প্রায় ১৯ বছর পর সেটিই ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ছবিগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

ফাইনালের আগে মেসির আবেগঘন স্মৃতিচারণ

বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে ম্যানহাটনে এক অনুষ্ঠানে মেসি সেই ছবির প্রসঙ্গ তুলে বলেন,

“আমি তার সঙ্গে ছবি তুলেছিলাম, যখন সে একেবারে শিশু ছিল। আর আজ আমরা দুজন বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলছি। সত্যিই অবিশ্বাস্য।”

মেসি ইয়ামালের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রশংসা করলেও মাঠে তাকে থামানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তারুণ্যের কাছে হার মানতে হয় কিংবদন্তিকে।

‘সিনেমার গল্প’ বলেও বিশ্বাস করা কঠিন

ফটোশুটের আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ট পুরো ঘটনাকে বলেছেন,

“এটি ভাগ্যের এক অলৌকিক ঘটনা। যদি কেউ এটি সিনেমার গল্প হিসেবে লিখত, মানুষ বিশ্বাস করত না।”

তিনি আরও বলেন, এতদিন ভাগ্যে বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু এই ঘটনার পর তার নিজের বিশ্বাসও বদলে গেছে।

এআই ছবি মনে হয়েছিল সতীর্থেরও

স্পেনের মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো স্বীকার করেন, প্রথমবার সেই ছবি দেখে তার মনে হয়েছিল এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দিয়ে তৈরি।

তার ভাষায়,

“ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দুই খেলোয়াড়ের এমন একটি ছবি বাস্তব হতে পারে—প্রথমে আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি।”

বিশ্বজয়ের নায়ক, মানবতারও কণ্ঠস্বর

শুধু ফুটবল নয়, মানবিক অবস্থানের কারণেও আলোচনায় রয়েছেন ইয়ামাল।

বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা জয়ের পর ছাদখোলা বাসে শিরোপা উদযাপনের সময় তিনি ফিলিস্তিনের একটি বিশাল পতাকা উড়িয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ান।

সেই ভিডিও মুহূর্তেই ভাইরাল হয়।

গাজার ছাত্র মুহাম্মদ আকরাম লেখেন,

“কারও কাছে এটি একটি সাধারণ পতাকা হতে পারে। কিন্তু গাজায় আমাদের কাছে এটি আশার প্রতীক।”

কোচ ফ্লিকের সমর্থন

ইয়ামালের ফিলিস্তিনপ্রীতি নিয়ে বার্সেলোনার কোচ হ্যান্সি ফ্লিক বলেন,

“আমি তাকে বলেছি—এটি যদি তোমার সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে সেটি তোমার অধিকার।”

ইনস্টাগ্রামে ৪ কোটিরও বেশি অনুসারী থাকা ইয়ামালের ফিলিস্তিনের পতাকাসহ পোস্টটি কয়েক মিলিয়ন লাইক পায়।

গাজা থেকেও ভালোবাসা

ফিলিস্তিনি লেখক মোসাব আবু তোহা মন্তব্য করেন,

“আমরা তোমাকে ভালোবাসি, গাজা থেকে।”

আরেক শিক্ষার্থী হাইথাম আল-মাসরি লেখেন,

“মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও আমাদের চোখে জল এনে দিয়েছে।”

বর্ণবাদ ও ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধেও সোচ্চার

মরক্কো থেকে আসা এক মুসলিম বাবার সন্তান ইয়ামাল।

তিনি স্পেনে ইসলামবিদ্বেষী আচরণের বিরুদ্ধেও প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন।

মিসরের বিপক্ষে এক ম্যাচে গ্যালারি থেকে মুসলিমবিদ্বেষী স্লোগান উঠলে ইয়ামাল সামাজিক মাধ্যমে লেখেন,

“আমি একজন মুসলিম। এটি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে লক্ষ্য করে বলা না হলেও একজন মুসলিম হিসেবে এটি আমার কাছে অসম্মানজনক এবং গ্রহণযোগ্য নয়।”

মেসির সবচেয়ে কাছাকাছি?

বার্সেলোনায় এখন মেসির কিংবদন্তি ১০ নম্বর জার্সিই পরেন ইয়ামাল।

একই পজিশনে খেলার কারণে তাদের তুলনা দীর্ঘদিনের।

ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ডেভিড বেকহ্যাম বলেন,

“মেসির সঙ্গে কারও তুলনা চলে না। তবে আমি যত খেলোয়াড় দেখেছি, ইয়ামালই মেসির সবচেয়ে কাছাকাছি।”

ফাইনালে গোল না করেও ম্যাচের অন্যতম সেরা

ফাইনালে গোলের খাতায় নাম তুলতে না পারলেও ইয়ামালের পারফরম্যান্স ছিল দুর্দান্ত।

ডানপ্রান্তে বারবার আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে আতঙ্ক ছড়িয়েছেন তিনি। বল পেলেই মনে হচ্ছিল যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেবেন।

ইউরো থেকে বিশ্বকাপ—রেকর্ডের পর রেকর্ড

ইউরো ২০২৪-এ স্পেনকে শিরোপা জেতানোর পর এবার বিশ্বকাপও জিতলেন ইয়ামাল।

মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ইউরোপ ও বিশ্ব—দুই মঞ্চেই নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিলেন তিনি।

স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে শুরু থেকেই তাকে নিজের মতো খেলার স্বাধীনতা দিয়েছেন। সেই আস্থার প্রতিদানও দিচ্ছেন ইয়ামাল।

মেসির অপূর্ণ বিদায়

এই বিশ্বকাপ জিতলে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে বিদায় নিতে পারতেন লিওনেল মেসি।

এর আগে ২০০৭ কোপা আমেরিকা, ২০১৪ বিশ্বকাপ, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের বেদনা তাকে বহন করতে হয়েছে।

২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেই অবসর নিয়েছিলেন। পরে ফিরে এসে লিওনেল স্কালোনির অধীনে জেতেন দুটি কোপা আমেরিকা ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপ।

কিন্তু এবার আর স্বপ্নপূরণ হলো না।

নতুন যুগের সূচনা

ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর যখন পরাজিত মেসি নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইয়ামালকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন, তখন ২০০৭ সালের সেই বাথটাবের ছবিটি যেন নতুন অর্থ পেল।

যে শিশুকে একদিন কোলে নিয়েছিলেন লিওনেল মেসি, সেই শিশুই আজ বিশ্বকাপ জিতে ফুটবল বিশ্বের নতুন নক্ষত্র।

সময়ের স্রোতে হয়তো ইয়ামাল একদিন মেসির সব রেকর্ড স্পর্শ করতে পারবেন কি না, সেটি ভবিষ্যৎই বলবে। তবে আপাতত বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম, সবচেয়ে আলোচিত তরুণ এবং মেসির উত্তরাধিকার বহনের সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে উঠে এসেছে লামিন ইয়ামাল।

প্রিন্ট করুন