
পুনর্বহালকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভের মধ্যে কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগ, হামলার ঘটনায় ভিডিওসহ লিখিত অভিযোগ প্রশাসনের
কুমিল্লার দেবীদ্বারে উপজেলার ৬ নম্বর ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যানের পুনর্বহালকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এ সময় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা (ইউপি সচিব) আবু হানিফ রানাকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। হামলায় তিনি আহত হন। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সোমবার (২০ জুলাই) সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশে ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মাসুদের পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছিল। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও স্থানীয় বিক্ষুব্ধ লোকজন জড়ো হন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, এ সময় একদল ব্যক্তি ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে ঢুকে ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা (ইউপি সচিব) আবু হানিফ রানার ওপর হামলা চালায়। তাকে কিল-ঘুষি ও চেয়ার দিয়ে মারধর করা হয়। হামলাকারীরা তার পরনের শার্ট ছিঁড়ে ফেলেন এবং কার্যালয়ের চেয়ার, টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর ও তছনছ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
খবর পেয়ে দেবীদ্বার থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে আহত ইউপি সচিবকে উদ্ধার করে দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৫ আগস্ট ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান মাসুদ আওয়ামী লীগ ত্যাগের ঘোষণা দেন। একই সময়ে রুবেল হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। পরে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিন মাসের ছুটিতে গিয়ে প্যানেল চেয়ারম্যান মো. সালাহউদ্দিন রুহুল (রুহুল আমিন)-এর কাছে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব অর্পণ করেন।
পরবর্তীতে হত্যা মামলায় হাইকোর্ট থেকে আট সপ্তাহের জামিন নিয়ে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে প্রায় এক মাস আগে তিনি আবারও হাইকোর্ট থেকে জামিন লাভ করেন। এরপর বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আবেদন করলে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পুনর্বহালের নির্দেশ আসে। সোমবার তার দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার কথা ছিল।
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সালাহউদ্দিন রুহুল (রুহুল আমিন) বলেন, রোববার (১৯ জুলাই) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ফোনে জানানো হয় যে বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশ অনুযায়ী চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মাসুদকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে হবে। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করা হয়। তবে বিষয়টি জানাজানি হলে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির কয়েকশ’ নেতাকর্মী ও সমর্থক ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দেন।
তার ভাষ্য, একপর্যায়ে কয়েকজন ব্যক্তি ইউপি সচিবের কক্ষে প্রবেশ করে সকালে তিনি কেন চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মাসুদের বাড়িতে গিয়েছিলেন—এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। পরে তারা সচিবকে মারধর করেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত যুব অধিকার পরিষদ কুমিল্লা উত্তর জেলা শাখার যুগ্ম সম্পাদক মো. রাসেল হোসেন বেগ বলেন, জুলাই আন্দোলনের ঘটনায় অভিযুক্ত একজন চেয়ারম্যানকে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে বিক্ষোভ হয়েছে। ইউপি সচিবের ওপর হামলার ঘটনাও ওই উত্তেজনার মধ্যেই ঘটে। তবে তিনি দাবি করেন, তিনি সেখানে উপস্থিত না থাকলে আরও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারত।
ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইউপি সচিব আবু হানিফ রানা ও চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মাসুদের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অশোক বিক্রম চাকমা বলেন, ইউপি সচিবের ওপর হামলার ঘটনায় কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে থানায় লিখিত এজাহার দেওয়া হয়েছে। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্রও পুলিশের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মাসুদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য উত্তেজনার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আগে থেকেই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। হামলার সময় পুলিশ কিছুটা দূরে অবস্থান করছিল। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং আহত ইউপি সচিবকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া অভিযোগ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

