প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

দুধ দিয়ে গোসল করে আ.লীগ ছাড়ার ঘোষণা দেওয়া চেয়ারম্যানকে ঘিরে তাণ্ডব, ইউপি সচিবকে পিটিয়ে আহত; ৩৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা

দেবীদ্বারের ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যানের পুনর্বহালকে কেন্দ্র করে হামলা-ভাঙচুরের পর ইউপি কার্যালয়ের চিত্র এবং দুধ দিয়ে গোসল করে আওয়ামী লীগ ছাড়ার ঘোষণা দেওয়া চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মাসুদের সংগৃহীত ছবি।
এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, বিশেষ প্রতিবেদক :

দুধ দিয়ে গোসল করা কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মাসুদের পুনর্বহালকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর, ইউপি সচিবকে মারধর এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে ৩৮ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এ মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

সোমবার (২০ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার ৬ নম্বর ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। ওই রাতেই ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা (ইউপি সচিব) আবু হানিফ রানা বাদী হয়ে দেবীদ্বার থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করেন।

কামরুজ্জামান মাসুদ ফতেহাবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ কার্যক্রম) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি দুধ দিয়ে গোসল করে আওয়ামী লীগ ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসেন। পরে জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে রুবেল হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি হন এবং দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন।

পুলিশ, লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশে সোমবার কামরুজ্জামান মাসুদের চেয়ারম্যান হিসেবে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণের কথা ছিল। বিষয়টি জানাজানি হলে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামনে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। একপর্যায়ে উত্তেজনার মধ্যে একদল ব্যক্তি ইউপি সচিব আবু হানিফ রানার কক্ষে ঢুকে তাকে মারধর করে। হামলাকারীরা চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

খবর পেয়ে দেবীদ্বার থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে আহত ইউপি সচিবকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর একাধিক মামলার আসামি হয়ে কামরুজ্জামান মাসুদ দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছিলেন। এ সময় তিনি অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিন মাসের ছুটিতে যান এবং ইউপি সদস্য মো. সালাউদ্দিন রুহুলকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেন।

পরবর্তীতে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে নিম্ন আদালতে হাজির হলে আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। প্রায় এক মাস আগে তিনি আবারও উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভ করেন। পরে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আবেদন করলে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ফিরে পান এবং সোমবার দায়িত্ব গ্রহণের কথা ছিল।

ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সালাউদ্দিন রুহুল বলেন, প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় ইউপি কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকেরা ইউপি সচিবের কক্ষে ঢুকে তাকে মারধর করেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে কামরুজ্জামান মাসুদের চেয়ারম্যান পদে পুনর্বহাল হওয়া কঠিন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এ বিষয়ে কামরুজ্জামান মাসুদ বলেন, “বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশেই আমি আমার পদে যোগদান করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মব সন্ত্রাসের আশঙ্কায় যেতে পারিনি। এখন প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয়, সেটাই দেখার বিষয়।”

মামলার বাদী ও হামলার শিকার ইউপি সচিব আবু হানিফ রানা বলেন, তিনি নিয়মিত দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের জন্য কার্যালয়ে গেলে জাকির হোসেন ও মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি তার কক্ষে ঢুকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। পরে তারা কিল-ঘুষি, লাথি ও লাঠি দিয়ে মারধর করেন এবং একপর্যায়ে চেয়ার দিয়ে মাথায় আঘাত করেন। হামলাকারীরা তাকে মেঝেতে ফেলে মারধরের পাশাপাশি অফিসের চেয়ার-টেবিলসহ আসবাবপত্র ভাঙচুর, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলা এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র নিয়ে যায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে থানায় মামলা দায়ের করেন।

দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “মামলা দায়েরের পর থেকে অভিযুক্তরা পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।”

প্রিন্ট করুন