
আজ বিশ্ব বাঘ দিবস। একসময় চোরা শিকারি, বনদস্যু ও মানুষের হামলায় সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়েছিল। তবে কঠোর আইন প্রয়োগ, স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে পরিস্থিতি এখন অনেকটাই বদলেছে। বাঘ হত্যা ও মানুষ-বাঘের সংঘাত কমলেও জলবায়ু পরিবর্তন, চোরা শিকার, পাচার এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার মতো চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।
আজ (২৯ জুলাই) বিশ্ব বাঘ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ শুধু একটি বিপন্ন প্রাণীকে রক্ষা নয়, বরং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লড়াই।
বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে বাঘ শিকার নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে বাঘ হত্যা, পাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত হয়। এরপর থেকেই প্রযুক্তিনির্ভর সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করে বন বিভাগ।
বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুমারিতে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৫টি। ২০১৪ সালে যেখানে ছিল ১০৬টি, ২০১৮ সালে ছিল ১১৪টি। ধারাবাহিক এই বৃদ্ধি সংরক্ষণ কার্যক্রমের ইতিবাচক ফল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে গত প্রায় আড়াই দশকে পূর্ব সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে চোরা শিকারিদের হাতে ২৬টি, বনদস্যুদের হাতে ১৮টি, গ্রামবাসীর পিটুনিতে ১৪টি, বার্ধক্যে ২১টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনটি বাঘ মারা গেছে। একই সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২৫ জন বনজীবী।
বন বিভাগের দাবি, স্মার্ট পেট্রোলিং, নিয়মিত টহল, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন নজরদারি ও বন অপরাধ দমনের ফলে ২০২৪ সালের পর থেকে সুন্দরবনে কোনো বাঘ হত্যা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘিনী। প্রায় ছয় মাস চিকিৎসার পর গত ১২ জুলাই সেটিকে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়। বাঘিনীর চলাচল পর্যবেক্ষণে বনাঞ্চলের প্রায় আট কিলোমিটার এলাকায় ২০টি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
বিশ্ব বাঘ দিবসের আগেই পূর্ব সুন্দরবনে তিন দিনের ব্যবধানে দুই দফা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা মেলে। চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র এবং শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী টাইগার পয়েন্ট এলাকায় বাঘের চলাচলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, নদী-খাল পেরিয়ে সাঁতার কেটে চলাচল করা বাঘের স্বাভাবিক আচরণের অংশ। তবে এত কাছ থেকে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সরকার সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, বন অপরাধ দমন ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ফলে বাঘ-মানুষের সংঘাত কমেছে। সম্প্রতি ক্যামেরা ট্র্যাপে নতুন তিনটি বাঘের ছবিও ধরা পড়েছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বন অনেকটাই মানব কোলাহলমুক্ত। ফলে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী স্বাভাবিক পরিবেশে বিচরণ করছে এবং বন অপরাধও কমেছে।
পরিবেশ সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’-এর প্রধান সমন্বয়কারী ড. নূর আলম শেখ বলেন, বন বিভাগ, স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশবাদী সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে। কারণ বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে, আর সুন্দরবন বাঁচলে উপকূলও নিরাপদ থাকবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. এ. আজিজ বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না, বাঘ রক্ষায় হরিণসহ পুরো খাদ্যশৃঙ্খল সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ মানে শুধু একটি প্রাণী রক্ষা নয়; বরং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, তার জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশকে টিকিয়ে রাখার লড়াই। তাই বিশ্ব বাঘ দিবসে তাদের আহ্বান—চোরা শিকার ও পাচার বন্ধ, বন ধ্বংস রোধ, খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।

