জব্দ ১৩০ কম্বল ‘গায়েব’! ওসির বিরুদ্ধে আত্মসাৎ, জালিয়াতি ও আদালতে মিথ্যা প্রতিবেদন—প্রমাণ মিললেও বহাল তবিয়তে দায়িত্বে
সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মনিরের বিরুদ্ধে চোরাচালানবিরোধী অভিযানে জব্দ করা ১৩০টি দামি ভারতীয় কম্বল আত্মসাৎ, আলামতের প্রকৃত সংখ্যা গোপন, আদালতে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন এবং তদন্তকে প্রভাবিত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একাধিক মামলার নথি, এসএমপি কমিশনারের অফিসিয়াল চিঠি, আদালতের কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব অভিযোগের সত্যতা উঠে এসেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মোগলাবাজার থানার একটি চোরাচালানবিরোধী অভিযানে (জিআর-০৫/২৬) একটি কাভার্ডভ্যান থেকে ৫৬০টি দ্বিস্তরবিশিষ্ট (ডাবল পার্ট) ভারতীয় কম্বল জব্দ করা হয়। তবে ওসি মনির হোসেনের নির্দেশে মামলার এজাহারে মাত্র ৪৩০টি কম্বল দেখানো হয় এবং কম্বলগুলোর প্রকৃত মানও গোপন রাখা হয়। এতে ১৩০টি কম্বল আত্মসাতের পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
তদন্তে আরও জানা যায়, এর আগে শাহপরান থানার একটি মামলায় (জিআর-২৬৫/২৫) আদালতের নিলাম থেকে ৬৫৮টি সিঙ্গেল পার্ট কম্বল কেনা হয়েছিল। পরে ওই নিলামের ৪৩০টি কম্বলকে মোগলাবাজার থানায় জব্দ করা কম্বল বলে আদালতে দাবি করে জিম্মায় নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এর মাধ্যমে আসল দামি কম্বল সরিয়ে নেওয়া এবং আত্মসাৎ করা অতিরিক্ত ১৩০টি কম্বল গোপনে ভাগ-বাটোয়ারার পরিকল্পনা ছিল।
মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের পর দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী তোবারক হোসেন। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তিনি থানায় সংরক্ষিত আলামত সরেজমিনে গণনা বা পরীক্ষা না করেই ১৯ ফেব্রুয়ারি আদালতে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন, যেখানে জব্দ করা কম্বলগুলোকে শাহপরান থানার নিলামকৃত কম্বল হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়।
প্রতিবেদনের সঙ্গে মামলার এজাহারের অসঙ্গতি ধরা পড়লে আদালত ২৩ ফেব্রুয়ারি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেন। আদালতের নাজির আজাদ মিয়ার নেতৃত্বে তদন্ত দল মোগলাবাজার থানায় গিয়ে সিলগালা করা কাভার্ডভ্যান খুলে পূর্ণ ৫৬০টি ডাবল পার্ট কম্বল উদ্ধার করে। কম্বলগুলো ‘নিউ জান্নাত’, ‘এনরোস চেরি’, ‘জিন্দাল ব্ল্যাংকেটস কিং’, ‘রয়েল গোল্ড’ ও ‘গোল্ড’ ব্র্যান্ডের ছিল।
পরবর্তীতে ৯ মার্চ তদন্ত কর্মকর্তা কাজী তোবারক হোসেন আদালতে হাজির হয়ে স্বীকার করেন যে, তিনি নিজে আলামত যাচাই না করেই অন্যের কথার ভিত্তিতে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলেও আদালত তা প্রত্যাখ্যান করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে এসএমপি কমিশনারকে নির্দেশ দেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে এসএমপি কমিশনার কাজী তোবারক হোসেনকে শোকজ (কৈফিয়ত তলব) করেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তার কর্মকাণ্ড পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে এবং তা শৃঙ্খলাভঙ্গ, গাফিলতি, নৈতিক স্খলন ও অসদাচরণের শামিল। তবে অভিযোগের মূল অভিযুক্ত ওসি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে এখনো কোনো প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আজকের কথার হাতে আসা কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, ওসি মনিরের সাবেক গাড়িচালক কনস্টেবল মো. শাখাওয়াত হোসেন জব্দ করা কাভার্ডভ্যান থেকে কম্বল নামিয়ে সরিয়ে নিচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘটনার পর চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অপারগ।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগেও শাহপরান থানার ওসি থাকাকালে জব্দ করা মালামাল আত্মসাতের অভিযোগে মনির হোসেনকে সেখান থেকে ক্লোজ করা হয়েছিল।
সব অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি মনির হোসেন বলেন, “কোনো কম্বল চুরি হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা গণনায় ভুল করেছিলেন। সব কম্বল থানা হেফাজতেই ছিল, পরে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।” এসএমপি কমিশনারের চিঠিতে তার নির্দেশে কম্বল চুরির কথা উল্লেখ থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “কেউ কারও বিরুদ্ধে লিখলে কম লিখে না, তাই লিখেছেন।”
এসএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. এনামুল হক বলেন, অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাদিম মাহমুদ বলেন, অভিযোগ সত্য হলে এটি শুধু অনিয়ম নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং পুলিশের ভাবমূর্তির জন্য বড় আঘাত। তার মতে, এ ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে জব্দকৃত আলামত আত্মসাৎ অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের দুর্নীতি। এ ঘটনায় বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি জালিয়াতি, আত্মসাৎ ও দুর্নীতির মামলা করে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত।

