
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ‘গভর্নিং বডি’: গঠন, ক্ষমতা, দায়িত্ব ও শৃঙ্খলামূলক কাঠামোর আইনি বিশ্লেষণ
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের (নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক) সার্বিক প্রশাসনিক স্থায়িত্ব, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ‘গভর্নিং বডি’, ‘ম্যানেজিং কমিটি’, ‘নির্বাহী কমিটি’, ‘অ্যাডহক কমিটি’ বা ‘বিশেষ পরিস্থিতি কমিটি’র ক্ষমতা ও দায়িত্বের একটি বিস্তারিত আইনি নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়েছে। শিক্ষা বোর্ডের বিধিমালা ও সরকারি নির্দেশনার আলোকে সংকলিত এই নীতিমালায় পরিচালনা পর্ষদের কাজের সীমানা, আর্থিক এখতিয়ার এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রশাসনিক শৃঙ্খলার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে।
সুষ্ঠু প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে এই আইনি কাঠামো ও দায়িত্বসমূহের বিবরণ প্রকাশ করেছেন অ্যাডভোকেট মো আবুল কালাম আজাদ।
১. পরিচালনা পর্ষদের মৌলিক দায়িত্ব ও কাজের সীমানা
প্রবিধানমালার বিধি ৪১ অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা তদারকীকরণ, লেখাপড়ার মান নিশ্চিতকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত কাজের মূল দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কমিটির ওপর ন্যস্ত থাকে।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য কমিটির কার্যপ্রক্রিয়া ও সাধারণ ক্ষমতা মূলত ৩টি প্রধান স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত:
- কমিটির নিয়মিত সভা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ: প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে অনুষ্ঠিত নিয়মিত সভার মাধ্যমেই যে কোনো সিদ্ধান্ত আইনি বৈধতা পায়।
- সম্পদ সংগ্রহ ও তহবিল গঠন: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন পরিচালনা ও উন্নয়নের প্রয়োজনে সম্পদ সংগ্রহ করা, সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা করা এবং প্রয়োজনীয় তহবিল গঠন করা কমিটির মৌলিক কাজ।
- সার্বিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা: প্রতিষ্ঠান যাতে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক দিক দিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়, তার সার্বিক দেখভাল নিশ্চিত করা।
২. আর্থিক ও প্রশাসনিক এখতিয়ার
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গভর্নিং বডি বা পরিচালনা পর্ষদকে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও আইনি এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
ক. তহবিল সংগ্রহ ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণ
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে সংগৃহীত যাবতীয় সম্পদ এবং গঠিত তহবিলের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং তা সার্বিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কমিটির দায়িত্ব।
খ. দান ও অর্পিত সম্পত্তি পরিচালনা
কোনো ব্যাংক, ব্যক্তি, দাতা সংস্থা বা অন্য কোনো মাধ্যম কর্তৃক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে উইলকৃত, দানকৃত কিংবা হস্তান্তরকৃত সকল প্রকার স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি গ্রহণ করা, সঠিক খাতে বিনিয়োগ করা এবং তা সঠিকভাবে পরিচালনা করা পরিচালনা পর্ষদের এখতিয়ারভুক্ত।
গ. উদ্বৃত্ত অর্থের নিরাপদ বিনিয়োগ
প্রতিষ্ঠানের বাৎসরিক আয় থেকে সকল ব্যয় মিটিয়ে যদি কোনো উদ্বৃত্ত অর্থ জমা থাকে, তবে তা প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে কোনো লাভজনক বা নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করার বিধান রাখা হয়েছে।
ঘ. কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি ও গ্র্যাচুইটি মঞ্জুর
শিক্ষক ও কর্মচারীদের অনুমোদিত অগ্রিম প্রদান এবং গ্র্যাচুইটি মঞ্জুর করার চূড়ান্ত ক্ষমতা পরিচালনা পর্ষদের হাতে থাকে। এছাড়া ছুটির বিধানের ক্ষেত্রে:
- চাকরির শর্তাবলি অনুসরণপূর্বক শিক্ষক ও কর্মচারীদের প্রাপ্য সাধারণ ছুটি মঞ্জুর করা।
- সরকারি নির্দেশনার আলোকে নৈমিত্তিক ছুটি ও অন্যান্য ছুটির বাৎসরিক তালিকা অনুমোদন নিশ্চিত করা।
ঙ. অবকাঠামো, সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র সুরক্ষা
প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাডেমিক মান ঠিক রাখতে শ্রেণিকক্ষের বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতি, অন্যান্য শিক্ষাপোকরণ, আসবাবপত্র ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল ক্রয়, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
চ. সহ-পাঠ্যক্রম ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম
শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানে বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করার দায়িত্ব কমিটির উপর ন্যস্ত।
৩. শৃঙ্খলামূলক কার্যাবলি ও প্রশাসনিক বিচারিক ক্ষমতা
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ডিসিপ্লিন বা শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পরিচালনা পর্ষদকে প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
- শিক্ষক-কর্মচারীদের শৃঙ্খলা বিধান: প্রতিষ্ঠানে পাঠদানের উপযুক্ত পরিবেশ ও পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখার জন্য শিক্ষক ও কর্মচারীদের ওপর শৃঙ্খলা রক্ষা করা গভর্নিং বডির মূল দায়িত্ব।
- দণ্ড ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ: প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী চাকরির শর্তাবলি লঙ্খন করলে বা বিভাগীয় অনাচার করলে নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত সাপেক্ষে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং যথাযথ দণ্ড অনুমোদনের সিদ্ধান্ত কমিটি নিতে পারবে।
- অতিরিক্ত পারিশ্রমিক গ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা: পরিচালনা পর্ষদের নিরপেক্ষতা রক্ষায় প্রবিধানমালায় বলা হয়েছে— সভাপতি ও সদস্যগণ নিয়োগ পরীক্ষার সম্মানি বাদে অন্য কোনো কারণে বা উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো রূপ অতিরিক্ত পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারবেন না।
৪. শিক্ষা বোর্ড ও সরকারি আদেশের বাধ্যবাধকতা
আইনগত কাঠামোর সর্বশেষ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, গভর্নিং বডি, ম্যানেজিং কমিটি, নির্বাহী কমিটি, অ্যাডহক কমিটি বা বিশেষ পরিস্থিতি কমিটিকে সময়ে সময়ে শিক্ষা বোর্ড এবং সরকার কর্তৃক অর্পিত অন্যান্য সকল অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। একই সাথে, শিক্ষা বোর্ড ও সরকারের জারিকৃত যে কোনো আদেশ, নির্দেশ বা প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়ন ও পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক তা প্রয়োগ করা বাধ্যতামূলক।
সচেতনতায়—
অ্যাডভোকেট মো আবুল কালাম আজাদ আইনজীবী ও শিক্ষা-উন্নয়ন বিষয়ক সচেতনতা কর্মী।

