
শিক্ষকশূন্য কুমিল্লা, সংকটে মুরাদনগরের প্রাথমিক শিক্ষা
প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ৮৯৪ বিদ্যালয়, ব্যাহত পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম
কুমিল্লা জেলার মুরাদনগরসহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। জেলার ২ হাজার ১০৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৯৪টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকের আরও ৯৭০টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এতে পাঠদান, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার সামগ্রিক মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ২ হাজার ১০৭টি অনুমোদিত প্রধান শিক্ষকের পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১ হাজার ২১৩ জন। ফলে ৮৯৪টি পদ খালি রয়েছে। অন্যদিকে, ১৩ হাজার ৩৮৯টি অনুমোদিত সহকারী শিক্ষকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১২ হাজার ৪১৯ জন। অর্থাৎ সহকারী শিক্ষকেরও ৯৭০টি পদ শূন্য।
মুরাদনগর উপজেলায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এখানে প্রধান শিক্ষকের ৯৪টি এবং সহকারী শিক্ষকের ৯৩টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এছাড়া দেবীদ্বারে প্রধান শিক্ষকের ৯৩টি ও সহকারী শিক্ষকের ১২৪টি, নাঙ্গলকোটে প্রধান শিক্ষকের ৯৫টি ও সহকারী শিক্ষকের ৭৭টি এবং দাউদকান্দিতে প্রধান শিক্ষকের ৬০টি ও সহকারী শিক্ষকের ৯২টি পদ খালি রয়েছে।
এই সংকটের বাস্তব চিত্র দেখা যায় কুমিল্লা সদর উপজেলার উত্তর রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত শতবর্ষী এই বিদ্যালয়ে গত ১০ বছর ধরে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। এ সময় পর্যায়ক্রমে পাঁচজন সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ২২৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য ছয়জন শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল আলম বলেন, প্রশাসনিক, আর্থিক ও দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চালিয়ে যেতে হয়। ফলে দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে পাঠদানে সময় ও মনোযোগ কমে যায়, যার প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানের ওপর।
শুধু উত্তর রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই নয়, জেলার আরও ৮৯৩টি বিদ্যালয়ে একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কোথাও সহকারী শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন, আবার কোথাও সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য থাকায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এতে পাঠ পরিকল্পনা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি তদারকি, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক প্রতিবেদন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
মুরাদনগরের বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী সৈয়দ কায়েস আহমদ মীর বলেন, দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। শিক্ষার মান উন্নয়নে দ্রুত শূন্য পদে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি কুমিল্লার সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ মিয়া বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব পড়ে। এতে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হয়। তিনি প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজের জন্য একজন হেড ক্লার্ক নিয়োগেরও দাবি জানান।
দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবিএম আতিকুর রহমান বাশার বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলায় শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনছুর আলী চৌধুরী বলেন, প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের সমস্যা শুধু কুমিল্লার নয়, এটি সারা দেশের চিত্র। ২০১৯ সালের পর থেকে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে শিক্ষাকার্যক্রমে বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন না।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে দেয়। সেখানে দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক না থাকলে সহকারী শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়, যা শ্রেণিকক্ষের পাঠদানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর প্রভাব পরবর্তী মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

