
‘কণ্ঠে ভাঙন নয়, ছিল ফেরার অঙ্গীকার; ধর্মান্ধদের তোষণেই নিজের পতনের ভিত্তি গড়েছিলেন শেখ হাসিনা’—তসলিমা নাসরিন
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাহসিকতার প্রশংসার পাশাপাশি রাজনৈতিক ভুল, ধর্মান্ধ শক্তির সঙ্গে আপস, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় স্বীকারের আহ্বান নির্বাসিত লেখিকার
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফেরার অঙ্গীকারে প্রশংসা করেছেন বিখ্যাত লেখিকা ড. তসলিমা নাসরিন। সাম্প্রতিক ভাষণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে নির্বাসিত প্রখ্যাত লেখক ড. তসলিমা নাসরিন। বক্তব্যে তিনি একদিকে শেখ হাসিনার সাহসিকতা ও দেশে ফেরার দৃঢ় সংকল্পের প্রশংসা করেছেন, অন্যদিকে তাঁর শাসনামলের রাজনৈতিক ভুল, ধর্মান্ধ শক্তির সঙ্গে আপস, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কড়া সমালোচনা করেছেন।
‘কণ্ঠে ভাঙন ছিল না, ছিল দেশে ফেরার অঙ্গীকার’
শেখ হাসিনার ভাষণ শুনে তসলিমা নাসরিন লেখেন, “দুই বছর দেশ থেকে দূরে থেকেও তাঁর কণ্ঠে ভাঙন ছিল না; ছিল দেশে ফেরার দৃঢ় সংকল্প। বত্রিশ বছর ধরে নির্বাসিত একজন মানুষ হিসেবে নিজের দেশে ফেরার এই আকুলতা আমি বুঝি। তাঁর দৃঢ়তা আমাকে স্পর্শ করেছে।”
বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞাকে ‘অগণতান্ত্রিক’ আখ্যা
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে সরকারি নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে তসলিমা নাসরিন বলেন, ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, বিরোধী কণ্ঠ দমন গণতন্ত্রের পরিপন্থী। তাঁর ভাষায়, শেখ হাসিনার কথা বলার, আত্মপক্ষ সমর্থনের এবং নিজের দেশে ফেরার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সরকার বা আদালত নয়, জনগণই ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে।

২০২৪ সালের আন্দোলন ও রাজনৈতিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার বক্তব্যের উল্লেখ করে তসলিমা নাসরিন বলেন, আন্দোলনটি পরিকল্পিতভাবে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, আন্দোলন চলাকালে প্রাণহানি, আহত হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের জন্য শেখ হাসিনার সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়, “শুধু ষড়যন্ত্রের কথা বললে ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না। নিজের ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; একজন নেতার সবচেয়ে বড় সাহস।”
‘ধর্মান্ধদের তোষণই পতনের পথ তৈরি করেছে’
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে ধর্মান্ধ শক্তির সঙ্গে আপসের বিষয়টি তুলে ধরেন তসলিমা নাসরিন। তিনি বলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে বারবার ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা করা হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, হেফাজতের দাবি মেনে পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রগতিশীল ও অমুসলিম লেখকদের লেখা বাদ দেওয়া, কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং ইসলামি জঙ্গিদের হাতে মুক্তচিন্তকরা নিহত হওয়ার পর তাঁদের পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো লেখকদের ধর্মের সমালোচনা না করার পরামর্শ দেওয়া ছিল গুরুতর রাজনৈতিক ভুল।
তসলিমা নাসরিনের ভাষায়, “ক্ষমতা রক্ষার জন্য যে ধর্মান্ধ জিহাদি অপশক্তিকে তিনি বছরের পর বছর তুষ্ট ও প্রশ্রয় দিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিই ছাত্রদের আন্দোলনে ঢুকে আন্দোলনটিকে নিজেদের রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করে তাঁর পতন ঘটিয়েছে। তিনি শুধু ষড়যন্ত্রের শিকার নন; ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে তাঁর ধারাবাহিক আপসই সেই ষড়যন্ত্র সফল হওয়ার জমি তৈরি করেছিল।”
তিনি আরও বলেন, ধর্মান্ধ শক্তিকে তুষ্ট করে সাময়িকভাবে ক্ষমতা রক্ষা করা গেলেও শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিই রাষ্ট্র ও ক্ষমতাকে গ্রাস করে—বাংলাদেশে তারই বাস্তব উদাহরণ দেখা গেছে।
স্বচ্ছ বিচার ও প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির আহ্বান
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে তসলিমা নাসরিন বলেন, তিনি চান শেখ হাসিনা দেশে ফিরুন। তবে সেই ফেরা যেন হত্যা, ফাঁসি বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্য না হয়; বরং স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের বিচারিক প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে হোক।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত অপরাধের বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনি তাঁর পতনের পর সংঘটিত হত্যা, লুটপাট, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারীর ওপর সহিংসতা, সাংবাদিক ও মুক্তচিন্তকদের কণ্ঠরোধ এবং ইসলামি মৌলবাদী সহিংসতারও সমানভাবে বিচার হতে হবে।
তাঁর ভাষায়, “ন্যায়বিচার বেছে বেছে করা যায় না।”
নিজের ভুল স্বীকার করেই ফিরতে হবে
প্রতিক্রিয়ার শেষাংশে বাংলাদেশকে প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তসলিমা নাসরিন বলেন, শেখ হাসিনাকে শুধু ক্ষমতার দাবিদার হিসেবে নয়, বরং নিজের শাসনের সাফল্য ও ব্যর্থতা—দুটোরই সত্য স্বীকার করতে প্রস্তুত একজন নেতা হিসেবে দেশে ফিরতে হবে।
তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনা যদি অতীতের গুরুতর রাজনৈতিক ভুলগুলো স্বীকার করেন এবং ভবিষ্যতে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে আর কখনো আপস না করার অঙ্গীকার করেন, তবে তাঁর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ পুনর্জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

