
৯ প্যাকেটে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার, মাথা-পা এখনো নিখোঁজ
কুমিল্লার দেবীদ্বারে ফরিদা বেগম (৫৫) নামে এক গৃহবধূকে নৃশংসভাবে হত্যার পর তাঁর মরদেহ অর্ধশতাধিক টুকরো করে বস্তা ও পলিথিনে প্যাকেট করে বাড়ির পেছনে ফেলে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে লাইলী বেগম (৩৫) নামে এক ভাড়াটিয়াকে আটক করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে লাইলী হত্যার কথা স্বীকার করেছেন এবং তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত থাকার কথা জানিয়েছেন বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
নিহত ফরিদা বেগম কুমিল্লার দেবীদ্বার পৌর এলাকার ছোটআলমপুর মোহনা আবাসিক এলাকার মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্ত্রী। শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে দেবীদ্বার দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়ার মালিকানাধীন বাসায় এ ঘটনা ঘটে।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বাড়ির পেছন থেকে পলিথিনে মোড়ানো একাধিক প্যাকেটে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
সকাল থেকে নিখোঁজ ছিলেন ফরিদা
স্বজনদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, শনিবার সকাল থেকেই ফরিদা বেগমের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁকে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে তাঁর সন্ধানে এলাকায় মাইকিং করা হয়।
স্বজনদের দাবি, ফরিদা বেগমকে খুঁজে না পেয়ে তাঁরা দেবীদ্বার থানায় নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে পুলিশ জিডি নেয়নি। তবে এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
এদিকে বিকেলের দিকে ফরিদা বেগমের বোনের ছেলে মামুন বাড়ির পেছনে গিয়ে সন্দেহজনক অবস্থায় কয়েকটি বস্তা ও প্যাকেট দেখতে পান। কাছে গিয়ে তিনি খণ্ডিত মরদেহ দেখতে পেয়ে বিষয়টি পুলিশকে জানান।
খবর পেয়ে দেবীদ্বার থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পলিথিন ও বস্তায় মোড়ানো মরদেহের খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করে। একই সঙ্গে ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া লাইলী বেগমকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
৯ প্যাকেটে খণ্ডিত মরদেহ
দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, পলিথিনে মোড়ানো ফরিদা বেগমের খণ্ডিত মরদেহের ৯টি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মরদেহের মাথা ও পা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ওসি বলেন, আটক লাইলী বেগমকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আরও চারজনের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁদের পরিচয় ও সম্পৃক্ততা যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁদের গ্রেপ্তারে পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে।
তবে নিহত ফরিদা বেগমকে ঠিক কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, কী কারণে হত্যা করা হয়েছে এবং মরদেহ কীভাবে এতগুলো অংশে বিভক্ত করা হয়েছে—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মাত্র আট দিন আগে বাসাটি ভাড়া নেন লাইলী
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লাইলী বেগমের স্বামী আবুল কালাম চট্টগ্রামে জাহাজে চাকরি করেন। ফরিদা বেগমের দুই মেয়ে রাবেয়া বসরী ও মরিয়ম আক্তারের বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁরা বর্তমানে নিজ নিজ সংসারে থাকেন। তাঁদের এক ছেলে কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।
এদিকে লাইলী বেগম প্রায় আট দিন আগে দেবীদ্বার পৌর এলাকার চাপানগর গ্রাম থেকে এসে ফরিদা বেগমদের মালিকানাধীন ওই বাসায় একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন বলে জানা গেছে।
এত অল্প সময়ের মধ্যে একই বাড়ির বাসিন্দা ফরিদা বেগমের সঙ্গে তাঁর কী ধরনের সম্পর্ক বা বিরোধ তৈরি হয়েছিল, কিংবা হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না—তা নিয়েও এলাকায় নানা আলোচনা চলছে।
পুলিশ বলছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে লাইলী বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁর দেওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামতও তদন্তের আওতায় নেওয়া হচ্ছে।
জিজ্ঞাসাবাদে সহযোগীদের নাম
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সময় লাইলী বেগম ফরিদা বেগমকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন সহযোগী ছিলেন বলেও জানিয়েছেন।
ওসি মো. মনিরুজ্জামানের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক লাইলী আরও চারজনের নাম উল্লেখ করেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে তাঁদের পরিচয় বা ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, লাইলীর দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাঁদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে।
লাইলীর বিরুদ্ধে পুরোনো হত্যা মামলার তথ্য
এদিকে স্থানীয় সূত্রে লাইলী বেগমকে ঘিরে একটি পুরোনো হত্যা মামলার তথ্যও সামনে এসেছে।
সূত্রের দাবি, ২০২১ সালের ৭ নভেম্বর দেবীদ্বার এলাকায় একটি শিশু হত্যার ঘটনায় লাইলী বেগমসহ পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছিল। ওই ঘটনার সঙ্গে লাইলীর ভাসুর আমির হোসেনের নামও জড়িত ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনার বর্ণনা অনুযায়ী, আমির হোসেনের সাত বছর বয়সী মেয়ে ফাহিমা তাঁর বাবাকে লাইলী বেগমের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ওই শিশুকে হত্যা করা হয় বলে মামলার অভিযোগে উঠে আসে। এরপর শিশুটির মরদেহ বস্তাবন্দি করে কাচিসাইর পুলের নিচে ফেলে রাখা হয়েছিল বলে জানা যায়।
পরে একই বছরের ১৪ নভেম্বর বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ওই ঘটনায় লাইলী বেগমসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ সময় পর তাঁরা জামিনে মুক্তি পান। এরপর লাইলীর স্বামী আবুল কালাম আবার বিয়ে করেন বলেও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।
তবে ওই পুরোনো মামলার সঙ্গে শনিবারের ফরিদা বেগম হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে পুলিশও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ
শনিবার বিকেলে ফরিদা বেগমের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে ছোটআলমপুর ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঘটনাস্থলে উৎসুক মানুষ ভিড় করেন। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মরদেহের অংশগুলো উদ্ধার করে।
স্থানীয়রা বলছেন, একজন গৃহবধূকে এভাবে হত্যার পর মরদেহ খণ্ডিত করে বাড়ির পেছনে ফেলে রাখার ঘটনা অত্যন্ত ভয়াবহ। তাঁরা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষ করে মরদেহের মাথা ও পা এখনো উদ্ধার না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এসব অংশ কোথায় রাখা হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডের পর কীভাবে মরদেহ সরানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, তা তদন্ত করে বের করার দাবি উঠেছে।
তদন্তে পুলিশের একাধিক দিক
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ, ভুক্তভোগীর সঙ্গে অভিযুক্তদের সম্পর্ক, পূর্ববিরোধ, আর্থিক বা ব্যক্তিগত কোনো দ্বন্দ্ব এবং অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না—সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা পলিথিন, বস্তা ও অন্যান্য আলামত পরীক্ষা করা হবে। মরদেহের উদ্ধার হওয়া অংশগুলোর ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং হত্যার ধরন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
তদন্তকারীরা লাইলী বেগমের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত ও অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখছেন। তাঁর উল্লেখ করা চার ব্যক্তির ভূমিকা কী ছিল, তাঁরা ঘটনার সময় কোথায় ছিলেন এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও যাচাই করা হচ্ছে।
পুলিশের বক্তব্য
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তের স্বার্থে এখনই সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য কাজ চলছে।
এদিকে ফরিদা বেগমের পরিবার ও স্বজনেরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, মরদেহের বাকি অংশ উদ্ধার এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

