

শেখ হাসিনার সঙ্গে নিজের তুলনা টানার সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনা ও তাঁর মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক অবস্থান, নির্বাসনের কারণ, আইনি অবস্থান এবং আদর্শের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
নিজের ফেসবুক পোস্টে তসলিমা নাসরিন বলেন, অনেকে শেখ হাসিনা ও তাঁকে একই পাল্লায় তুলছেন এবং দুজনকেই মুসলমান ও রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে উল্লেখ করছেন। তাঁর ভাষ্য, এই দুই দাবিই সঠিক নয়।
তসলিমা নাসরিন নিজেকে ‘হার্ডকোর নাস্তিক’ উল্লেখ করে বলেন, তিনি কোনো ঈশ্বর, ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মীয় বিধানে বিশ্বাস করেন না। অন্যদিকে শেখ হাসিনা ধর্ম পালনকারী মুসলমান—এমন দাবি করেন তিনি।

নিজের দেশ থেকে দূরে থাকা ছাড়া শেখ হাসিনা ও আমার মধ্যে বড় কোনো মিল নেই; পরিচয়, আদর্শ ও নির্বাসনের বাস্তবতায় আমাদের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য।
নিজের ভারতে অবস্থান প্রসঙ্গে তসলিমা বলেন, তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী নন। ভারত সরকার তাঁর থাকা-খাওয়া বা জীবনযাপনের ব্যয় বহন করে না। নিজের সব খরচ নিজেই বহন করেন এবং ভারত সরকার শুধু তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সুইডেনের নাগরিক এবং সেই পরিচয়েই ভারতে বসবাস করছেন।
তসলিমা নাসরিন আরও বলেন, ভারত কোনো বিদেশি শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী বা গবেষকের কাজ ও অবদান বিবেচনা করে তাঁকে বৈধভাবে দেশটিতে বসবাসের অনুমতি দিতে পারে। তাঁর মতে, এ ধরনের অনুমতি রাজনৈতিক আশ্রয়ের সমতুল্য নয়।
শেখ হাসিনার সঙ্গে নিজের সবচেয়ে বড় পার্থক্যগুলোর একটি হিসেবে ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেন তসলিমা নাসরিন।
তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। বিপরীতে তিনি সব শিশুর জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে। তাঁর মতে, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড থেকে ধর্মকে দূরে রাখা উচিত।
তসলিমা নাসরিন শেখ হাসিনা সরকারের ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পেরও সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, এসব মসজিদ একসময় শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা তিনি প্রকল্পের শুরুতেই প্রকাশ করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতাশালী রাজনীতিক, আর তিনি ক্ষমতাহীন একজন লেখিকা। শেখ হাসিনার নির্বাসন দুই বছরের হলেও তাঁর নিজের নির্বাসন ৩২ বছরের বলে উল্লেখ করেন তসলিমা।
বাংলাদেশে নিজের ফেরার প্রসঙ্গে তসলিমা নাসরিন বলেন, বাংলাদেশের কোনো সরকারই তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্ট নবায়ন করেনি এবং তাঁর বিদেশি পাসপোর্টেও ভিসা দেয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে ফেরার পথ তাঁর জন্য বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের ভূমিকাও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশে ফেরার পথ বন্ধ রাখার দায় শেখ হাসিনা সরকারেরও রয়েছে।
তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে নিজের অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরে তসলিমা বলেন, তিনি চান শেখ হাসিনা নিজ দেশে ফিরে নিরাপদে বসবাস করুন এবং রাজনীতি করুন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবিও তিনি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন বলে উল্লেখ করেন।
তসলিমা নাসরিনের ভাষ্য, তিনি নিজের দেশে ফিরে নিরাপদে বসবাস করতে চান এবং শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও একই প্রত্যাশা রাখেন। তাঁর মতে, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও তাঁর মতো একজন ধর্ম ও জিহাদবিরোধী লেখিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ফিরতে পারলেও তাঁকে জিহাদিদের হামলার ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে। এ কারণে দেশে ফিরে নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন কি না, সেটি নিয়েও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তসলিমা নাসরিন নিজেকে বাক্স্বাধীনতার প্রবল সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনার সঙ্গে এ ক্ষেত্রেও তাঁর পার্থক্যের কথা তুলে ধরেন।
তিনি দাবি করেন, ১৯৯৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্ত আত্মজীবনী ‘আমার মেয়েবেলা’ নিষিদ্ধ করেছিল এবং সেই নিষেধাজ্ঞা এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি।
সবশেষে তসলিমা নাসরিন বলেন, নিজের দেশ থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হওয়া ছাড়া তাঁর সঙ্গে শেখ হাসিনার বড় কোনো মিল নেই। শুধু এই একটি মিলের ভিত্তিতে দুজনের পরিচয়, অবস্থান, আদর্শ ও জীবনসংগ্রামকে একইভাবে দেখাকে তিনি ‘ভুল তথ্য’ ছড়ানো হিসেবে উল্লেখ করেন।