
ধানমন্ডি-৩২ নম্বরে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই পুলিশের উপস্থিতিতে আবারও ‘মব’ সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এলাকায় আসা এক যুবককে পুলিশ আটক করার পাশাপাশি সন্দেহের অভিযোগে এক সাংবাদিক ও এক রিকশাচালককে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনা ঘটেছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) সকাল থেকে দুপুর ১টার মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ, এপিবিএন ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্য মোতায়েন থাকলেও সাংবাদিক ও রিকশাচালককে মারধরের সময় পুলিশের ভূমিকা ছিল অনেকটা নিষ্ক্রিয়।
পরে মারধরের শিকার ওই দুই ব্যক্তিকে পুলিশ থানায় নিয়ে যায়। তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় পরে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ফুল দিতে এসে আটক যুবক
সকালে ধানমন্ডি-৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভেঙে ফেলা বাড়ির সামনে ফুল দিতে আসেন অর্ণব দাস (৪০) নামে এক যুবক। সাদা পোশাকে থাকা গোয়েন্দা পুলিশ সদস্যরা তাকে আটক করে পরিচয় ও সেখানে আসার কারণ জানতে চান।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে অর্ণব নিজেকে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন যুবলীগের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন বলে জানা গেছে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গাড়িতে করে ধানমন্ডি থানায় নেওয়া হয়।
‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে অবস্থান, সন্দেহ হলেই মারধরের অভিযোগ
ঘটনাস্থলে রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম (এসডিএফ)-এর সদস্যসচিব আ ন ম আয়াসের নেতৃত্বে একদল যুবক অবস্থান করছিলেন। তারা নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তারা বিভিন্ন ব্যক্তির ছবি ও ভিডিও ধারণ এবং তাদের পরিচয় জানতে চাইছিলেন। এরই মধ্যে কাউকে সন্দেহ হলেই মারধর করার অভিযোগ ওঠে।
দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ৩২ নম্বরে প্রবেশ সড়কের মুখে এক রিকশাচালক মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। একপর্যায়ে আয়াস তার কাছে গিয়ে মোবাইল ফোন পরীক্ষা করেন। ওই রিকশাচালক ভিডিওটি যুবলীগের একজনকে পাঠিয়েছেন—এমন অভিযোগ তুলে তাকে দলবদ্ধভাবে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, মারধরে রিকশাচালক গুরুতর আহত হন। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফুলে যায়। ঘটনাস্থলের কাছেই পুলিশ, এপিবিএন ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও প্রথম দিকে তারা হামলা ঠেকাতে এগিয়ে আসেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে কয়েকজন পুলিশ সদস্য এসে রিকশাচালককে থানায় নিয়ে যান।
সাংবাদিককেও মারধরের অভিযোগ
এরপর আরেক ব্যক্তিকে সন্দেহ করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন সেখানে থাকা কয়েকজন। ওই ব্যক্তি নিজেকে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু তার পরিচয় ও সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন নিয়ে নানা প্রশ্ন করা হলে তিনি ঘাবড়ে যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একপর্যায়ে আ ন ম আয়াস ও তার সঙ্গে থাকা লোকজন ওই ব্যক্তিকে মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
পুলিশের পক্ষ থেকে পরে জানানো হয়, ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া না যাওয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
‘এটা মব নয়’—আয়াসের দাবি
দলবদ্ধভাবে মানুষকে মারধরের অভিযোগের বিষয়ে আ ন ম আয়াস সাংবাদিকদের বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা যাতে কোনো ধরনের অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সে জন্য তারা সেখানে অবস্থান করছেন। কাউকে সন্দেহ হলে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
মারধরের ঘটনাকে ‘মব’ বলতে রাজি নন আয়াস। তার দাবি, কাউকে মারধর করে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিলে সেটি মব হতো। তারা কারও টাকা-পয়সা নিচ্ছেন না, তাই লোকজন নিয়ে কাউকে মারধর করলেও সেটিকে মব বলা যাবে না।
তার বক্তব্যের পক্ষ নিয়ে নিজেকে তাঁতী দলের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক পরিচয় দেওয়া ড. কাজী মনিরুজ্জামান মনিরও বক্তব্য দেন। তিনি দলবদ্ধভাবে মারধর করে অর্থ ছিনিয়ে নেওয়াকেই মব হিসেবে ব্যাখ্যা করেন এবং আয়াসের কর্মকাণ্ডকে মব নয় বলে দাবি করেন।
পুলিশের বক্তব্য
ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম সন্ধ্যা ৭টার দিকে বলেন, অর্ণব দাস নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। তার বাড়ি টাঙ্গাইলে এবং তিনি নিজেকে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন যুবলীগের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
ওসি বলেন, আরও দুজনকে থানায় আনা হয়েছিল—তাদের একজন সাংবাদিক এবং অন্যজন রিকশাচালক। তাদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। মূলত নিরাপত্তার জন্য তাদের থানায় নেওয়া হয়েছিল।
তবে ওসি দাবি করেন, সেখানে কোনো মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। কেউ অভিযোগ করলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে মব সহিংসতার অভিযোগের বিষয়ে ডিএমপির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেই ঘটল ঘটনা
ধানমন্ডি-৩২ নম্বর বাড়িকে ঘিরে শনিবার ভোর থেকেই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয় পুলিশ। ধানমন্ডি থানা পুলিশের পাশাপাশি রিজার্ভ পুলিশ, এপিবিএন ও গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।
৩২ নম্বর সড়কের দুই প্রান্তে ব্যারিকেড দেওয়া হয়। ব্যারিকেডের ভেতরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিলেন। এপিবিএন সদস্যদের ফুটপাতে চেয়ার পেতে অবস্থান করতে দেখা যায়। বাড়ির সামনের লেকপাড়েও পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।
এ ছাড়া এপিসি ও জলকামানও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। এমন কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেই সাংবাদিক ও রিকশাচালককে প্রকাশ্যে মারধরের অভিযোগ ওঠায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

