
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নে গ্রাম্য সালিশের নামে এক নারীকে প্রকাশ্যে জুতাপেটা করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। ভিডিওতে মাধবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফরিদ উদ্দিনকে ওই নারীকে জুতাপেটা করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেলে উপজেলার বলাকিয়া গ্রামে একটি সালিশ বৈঠকে এ ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, গ্রামের মানুষের উপস্থিতিতে চেয়ারম্যান ওই নারীকে জুতাপেটা করছেন। ঘটনাস্থলে বেশ কয়েকজন নারী, পুরুষ ও শিশু-কিশোরকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

স্থানীয়দের দাবি, মাধবপুর ইউনিয়নের চারিপাড়া গ্রামের বিল্লাল হোসেন নামে এক যুবকের সঙ্গে ওই নারীর কথিত পরকীয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সালিশ বৈঠকটি বসানো হয়। বৈঠকে ওই নারী ও ওই পুরুষের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। তবে ওই পুরুষকে কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তার কোনো ভিডিও বা নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রশ্ন উঠেছে—কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও গ্রাম্য সালিশে প্রকাশ্যে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত বা জুতাপেটা করার এখতিয়ার কারও আছে কি না। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এ ধরনের শাস্তি দেওয়ার বৈধতা নিয়েও দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।
সামাজিক বিচারের রায় আমি কার্যকর করেছি মাত্র।
মাধবপুর ইউনিয়ন পরিষদ
তবে সালিশে এ ধরনের শাস্তি দেওয়ার আইনগত বৈধতা রয়েছে কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দিতে পারেননি চেয়ারম্যান।
‘অভিযোগ না পেলে ব্যবস্থা নয়’—পুলিশের বক্তব্য
ব্রাহ্মণপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ফারুক হোসেন বুধবার দুপুরে বলেন, “এ. বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কারণ এখন পর্যন্ত কেউ কোনো অভিযোগ দায়ের করেননি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে এখানেই সামনে এসেছে আরও বড় প্রশ্ন—যে নারীকে কথিত পরকীয়ার অভিযোগ তুলে গ্রামের মানুষের সামনে প্রকাশ্যে জুতাপেটা করা হয়েছে, সামাজিক লজ্জা, ভয় ও পারিবারিক চাপের কারণে তিনি কি আদৌ থানায় গিয়ে অভিযোগ করার সাহস পাবেন?
একজন নারী প্রকাশ্য জনসম্মুখে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরও কি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগই একমাত্র শর্ত? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি দৃশ্যমান ঘটনার বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে তদন্ত করতে পারে না—এমন প্রশ্নও উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কারও বিরুদ্ধে পরকীয়াসহ কোনো অভিযোগ থাকলে সেটি তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়। কোনো সালিশ বা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজের হাতে শাস্তি কার্যকর করতে পারেন না। বিশেষ করে প্রকাশ্যে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
ঘটনার ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এখন সেটিই দেখার বিষয়।

