
প্যারোলের খবরের আড়ালে যে মেয়ের গল্প: বাস্তবের মাটিতে যেন ‘সাতকাহন’-এর দীপাবলী
বাবা নেই।
বাবার লাশ বাড়িতে পড়ে আছে, নিথর দেহ।
আর মা—কারাগারে।
একজন মেয়ের জন্য এর চেয়ে কঠিন বাস্তবতা আর কী হতে পারে?
বাবাকে হারানোর শোক সামলানোর আগেই মায়ের জন্য ছুটতে হলো তাকে। কারাগারে বন্দি মাকে বাবার শেষ মুখটি দেখাতে হবে। প্রয়োজন প্যারোলের। প্রয়োজন প্রশাসনিক অনুমোদনের। আর সেই দায়িত্ব এসে পড়ল মেয়েটির কাঁধে।
মেয়েটির নাম তানী দীপাবলী নেওয়াজ।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও প্রয়াত সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের মেয়ে তিনি। তৌফিক নেওয়াজের মৃত্যুর পর মায়ের প্যারোলের জন্য আবেদন করেছিলেন দীপাবলী। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই দীপু মনিকে স্বামীর জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়।
কিন্তু এই ঘটনার সবচেয়ে মানবিক অধ্যায়টি যেন প্যারোলের সরকারি আদেশের আড়ালেই থেকে গেছে।
বাবাকে হারানোর দিনেই শুরু মায়ের জন্য লড়াই
ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজ মারা গেলেন। পরিবারের ওপর নেমে এলো শোকের ছায়া।
কিন্তু শোক পালনের সুযোগটুকুও যেন দীপাবলীর সামনে পুরোপুরি ছিল না।
কারণ, তাঁর মা তখন মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে।
বাবার মরদেহ ঢাকায়।
মা কারাগারে।
আর মেয়েটিকে দাঁড়াতে হলো এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মায়ের সঙ্গে দেখা করতে কারাগারে যান দীপাবলী। এরপর মায়ের প্যারোলের জন্য মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে কয়েক দিনের প্যারোল চাওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার অনুমোদন দেওয়া হয়।
সেই ১২ ঘণ্টার পেছনে ছিল একটি মেয়ের ছুটে চলা।
নিজের শোক ভুলে মায়ের কথা ভাবা
বাবাকে হারানোর পর একজন সন্তানের প্রথম কাজ হওয়ার কথা নিজের শোক সামলানো।
কিন্তু দীপাবলীর সামনে তখন অন্য এক দায়িত্ব।
মা যেন স্বামীর মুখটি শেষবারের মতো দেখতে পারেন।
মা যেন জানাজায় থাকতে পারেন।
মা যেন স্বামীকে শেষ বিদায় জানাতে পারেন।
এই চাওয়াটুকু পূরণ করতেই নিজের কষ্টকে যেন সাময়িকভাবে পাশে সরিয়ে রাখলেন তিনি।
কারাগার থেকে প্রশাসনিক কার্যালয়—আবেদন, অনুমোদন, অপেক্ষা—সবকিছুর মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেলেন একজন মেয়ে।
শিরোনাম হলো ‘দীপু মনি প্যারোলে’, গল্পটি কিন্তু দীপাবলীর
পরদিন সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এলো—
‘১২ ঘণ্টার প্যারোলে দীপু মনি’
স্বাভাবিকভাবেই এটি ছিল বড় সংবাদ। একজন সাবেক মন্ত্রী স্বামীর মৃত্যুর পর প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন—জাতীয়ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
কিন্তু সেই সংবাদটির পেছনে আরেকটি গল্প ছিল।
একজন মেয়ের গল্প।
যে মেয়েটি বাবাকে হারানোর পরও মায়ের জন্য ছুটেছিল।
যে মেয়েটি জানত, মায়ের কাছে হয়তো এটাই শেষ সুযোগ—জীবনসঙ্গীকে শেষবারের মতো দেখা।
দীপু মনি ২০ আগস্ট সকালে মুন্সীগঞ্জ কারাগার থেকে প্যারোলে বের হয়ে ঢাকায় যান। তিনি স্বামীর জানাজা ও দাফনে অংশ নেন এবং নির্ধারিত সময় শেষে আবার মুন্সীগঞ্জ কারাগারে ফিরে যান।
এখানেই মনে পড়ে ‘সাতকাহন’-এর দীপাবলী
কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের কালজয়ী উপন্যাস ‘সাতকাহন’-এর দীপাবলী বাঙালি পাঠকের কাছে সংগ্রাম, আত্মনির্ভরতা ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়ার এক প্রতীকী চরিত্র।
জীবনের কঠিন আঘাত তাকে থামাতে পারেনি।
সামাজিক বাধা তাকে ভেঙে দিতে পারেনি।
নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করতে হয়েছিল তাকে।
বাস্তব জীবনের এই দীপাবলী অবশ্য উপন্যাসের চরিত্র নন।
তাঁর সামনে কোনো গল্পের পৃষ্ঠা নেই।
আছে বাস্তব জীবন।
আছে বাবাকে হারানোর শোক।
আছে কারাগারে বন্দি মা।
আছে প্রশাসনিক জটিলতা।
আর আছে একজন মেয়ের দায়িত্ব।
তবুও দুই দীপাবলীর মধ্যে কোথায় যেন একটি অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়—প্রতিকূলতা যখন সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন পিছিয়ে না গিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস।
‘মা যেন বাবাকে শেষবার দেখতে পারেন’
দীপাবলীর সেই দিনের পুরো অনুভূতি হয়তো কোনো প্রতিবেদনে লেখা সম্ভব নয়।
কারণ কিছু অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
বাবার মৃত্যুর খবর শোনার পর একজন মেয়ে যখন মায়ের কাছে যায়, তখন সে শুধু সংবাদ বহন করে না—বহন করে এক পৃথিবী শোক।
তারপর যখন সেই মেয়েকেই মায়ের প্যারোলের জন্য আবেদন করতে হয়, তখন তার নিজের কান্নার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় মায়ের শেষ দেখা নিশ্চিত করার দায়িত্ব।
এখানেই দীপাবলীর গল্পটি আলাদা।
এটি শুধু প্যারোলের গল্প নয়।
এটি একজন মেয়ের দায়িত্ববোধের গল্প।
ছবির মানুষটির চোখে যেন অনেক কথা
ছবিতে দেখা যায়, সাদা পোশাকে মাথা ঢাকা এক নারী সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। মুখে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। চোখেমুখে ক্লান্তি ও গাম্ভীর্য।
এই ছবিটিকে যদি শুধু একজন রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যের ছবি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ছবিটির বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যাবে।
ছবিটির পেছনে আছে একজন মৃত বাবা।
আছে কারাগারে থাকা একজন মা।
আছে মায়ের জন্য ছুটে চলা এক মেয়ে।
আর আছে এমন এক সময়, যখন নিজের শোকের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে দায়িত্ব।
ইতিহাস বড় ঘটনাকে মনে রাখে, মানুষ মনে রাখে ছোট দৃশ্য
রাজনীতির ইতিহাসে প্যারোল একটি প্রশাসনিক ঘটনা।
কিন্তু পারিবারিক ইতিহাসে এটি অন্যরকম।
একজন স্ত্রী স্বামীর শেষ বিদায়ে যেতে পেরেছিলেন।
আর সেই সুযোগ তৈরি করার জন্য একজন মেয়ে বাবাকে হারানোর শোকের মধ্যেও ছুটে বেড়িয়েছিলেন।
সময়ের সঙ্গে হয়তো প্যারোলের সরকারি কাগজটি হারিয়ে যাবে।
খবরের কাগজের শিরোনামও পুরোনো হয়ে যাবে।
কিন্তু একজন মেয়ের সেই ছুটে চলার গল্প—যদি ঠিকভাবে বলা যায়—তা মানুষের মনে থেকে যেতে পারে অনেক বেশি দিন।
উপন্যাসের দীপাবলী আর বাস্তবের দীপাবলী
সমরেশ মজুমদারের দীপাবলী আমাদের শিখিয়েছেন—জীবন যত কঠিনই হোক, লড়াই থামানো যায় না।
আর বাস্তবের দীপাবলী যেন সেই কথাটিই নতুন করে মনে করিয়ে দিলেন।
তবে তাঁর লড়াই ছিল কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠা বা ব্যক্তিগত স্বপ্নের জন্য নয়।
ছিল বাবা-মায়ের শেষ সম্পর্কটির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে।
বাবা আর নেই।
মা তখন বন্দি।
আর সেই মেয়েটি দাঁড়িয়ে রইলেন দুই প্রান্তের মাঝখানে।
তারপর ছুটলেন।
মায়ের জন্য।
বাবার শেষ বিদায়ের জন্য।
একজন সন্তানের শেষ দায়িত্বের জন্য।
হয়তো এ কারণেই এই গল্পটি শুধু ‘দীপু মনির প্যারোল’-এর গল্প নয়।
এটি এক মেয়ের গল্প—যে নিজের বাবাকে হারানোর শোক বুকের মধ্যে রেখেও মাকে বাবার শেষ মুখটি দেখাতে লড়েছিল।
সেদিন বাস্তবের পথে যে দীপাবলী হেঁটেছিলেন, তাঁর গল্প হয়তো কোনো উপন্যাসের চেয়ে কম বেদনাদায়ক নয়।
বরং জীবন কখনো কখনো উপন্যাসের চেয়েও নির্মম গল্প লিখে ফেলে।
আর সেই গল্পের নাম—দীপাবলী।
উপশিরোনাম: প্যারোলের খবরের আড়ালে একজন মেয়ের একাকী লড়াই
ছবির ক্যাপশন: বাবার মৃত্যুর পর মায়ের প্যারোলের জন্য আবেদন করতে ছুটে চলা তানী দীপাবলী নেওয়াজ। ছবি: সংগৃহীত
ট্যাগ: দীপাবলী, দীপু মনি, তৌফিক নেওয়াজ, মুন্সীগঞ্জ, প্যারোল, সাতকাহন, মানবিক গল্প, বিশেষ প্রতিবেদন

