

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে গেছে। ওই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা শুধু তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সমাবেশকেই রক্তাক্ত করেনি; এর অভিঘাতে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যকার দূরত্বও ক্রমশ গভীর হয়েছে। প্রশ্ন হলো—এই ঘটনার আগে কি দুই দলের সম্পর্ক এতটাই বৈরী ছিল?
আমার দেখা রাজনৈতিক বাস্তবতা কিন্তু কিছুটা ভিন্ন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পরস্পরের কঠোর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিল, সংসদে ও রাজপথে একে অপরের তীব্র সমালোচনা করেছে; কিন্তু ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে একটা সৌজন্যবোধও ছিল। এমন সময়ও দেখেছি, বিকেলে মাঠের বক্তৃতায় একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেছেন, অথচ রাতে একই ডিনার টেবিলে পাশাপাশি বসেছেন। দুই দলের নেতাদের পরস্পরের সামাজিক অনুষ্ঠানেও দেখা যেত।
১৯৯০ সালে বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতন ঘটায়। এরপর ১৯৯১ সালের গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ চলে যায় বিরোধী দলে।

তখন আওয়ামী লীগ সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের দাবি তোলে। বিএনপির তৎকালীন অবস্থান ছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার পক্ষে। কিন্তু বিরোধী দলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়।
১৯৯৪ সালে মাগুরার একটি উপনির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি তোলে। বিএনপি প্রথমদিকে সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাপে শেষ পর্যন্ত সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করে।
১৯৯৬ সালে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। বিএনপি চলে যায় বিরোধী দলে। এরপর নানা ইস্যুতে দুই দলের মধ্যে আন্দোলন-সংগ্রাম চললেও রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের সৌজন্য তখনও বিদ্যমান ছিল।

রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, তবে প্রতিহিংসা নয়। দেশের স্বার্থে রাজনৈতিক সহাবস্থান ও সমঝোতার পথেই ফিরতে হবে।
এরই মধ্যে দেশে ধারাবাহিক বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা এবং ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে বোমা হামলা ছিল বাংলা সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর উগ্রবাদী হামলার ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।
২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থেকে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যায়।
এরপর আসে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। হামলায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভী রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন এবং শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন।
বিরোধী দলের একটি রাজনৈতিক সমাবেশে এমন নারকীয় হামলা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। পরবর্তী সময়ে এই হামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নানা বিতর্ক, বিশেষ করে ‘জজ মিয়া’ কাহিনি, আওয়ামী লীগের মধ্যে বিএনপিকে ঘিরে গভীর অবিশ্বাস ও ক্ষোভ তৈরি করে।
আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশের মধ্যে তখন এই ধারণা শক্তিশালী হয় যে, তাদের নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই হামলাটি ঘটানো হয়েছিল। সেই ক্ষোভ ও অবিশ্বাস পরবর্তী সময়ে দুই দলের রাজনৈতিক সম্পর্ককে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যায়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির বিরুদ্ধে কঠোর রাজনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব, তারেক রহমানের দীর্ঘদিন দেশে ফিরতে না পারা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল—সব মিলিয়ে দুই দলের দূরত্ব আরও বাড়তে থাকে।
একই সময়ে উগ্রবাদ ও ধর্মীয় রাজনীতিকে ঘিরেও আওয়ামী লীগ সরকারের নানা নীতি ও রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার কৌশল এবং ২১ আগস্টের ক্ষত থেকে তৈরি হওয়া প্রতিশোধের রাজনীতি—দুই পক্ষের সম্পর্ককে আরও সংঘাতপূর্ণ করে তোলে।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এর পেছনে রাজনৈতিক আন্দোলন, জনঅসন্তোষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন বিতর্ক এবং উগ্রবাদী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সক্রিয় ভূমিকা—সবকিছুর সমন্বিত প্রভাব ছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে নানা মত রয়েছে।
তবে একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই—বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দূরত্ব বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভারসাম্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
আজ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—বাংলাদেশের মতো একটি দেশে দীর্ঘদিনের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল এবং সেই দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিপুল জনগোষ্ঠীকে কি রাজনীতির বাইরে রেখে দেওয়া সম্ভব?
ইতিহাস অন্তত একটি শিক্ষা দেয়—রাজনৈতিক দলকে কেবল দমন করে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া সহজ নয়। গত ১৫ বছর নানা চাপ ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও বিএনপিকে বিলীন করা সম্ভব হয়নি। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও ইতিহাসের সেই বাস্তবতা প্রযোজ্য হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সম্ভবত প্রতিশোধ নয়, রাজনৈতিক সহাবস্থান ও গণতান্ত্রিক সমঝোতা।
বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি শত্রুতায় পরিণত হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র, গণতন্ত্র এবং সাধারণ মানুষ।
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের রক্তাক্ত অধ্যায় তাই শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ওপর হামলার ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির বিভাজনেরও একটি বড় বাঁক।
ইতিহাসের সত্য পুরোপুরি কখনো এক বাক্যে ধরা পড়ে না। সময়ের সঙ্গে নতুন তথ্য, নতুন দলিল ও নতুন বিচার সেই ইতিহাসকে আরও পরিষ্কার করে।
বাংলাদেশে প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা রাজনৈতিক পুনর্মিলনের রাজনীতি কখনো প্রতিষ্ঠিত হবে কি না—সেই উত্তরই এখন ভবিষ্যতের হাতে।