
বাগেরহাটে সড়কের পাশে দুই বছরের দুই বছরের এক শিশুকে একা ফেলে রেখে তার মা ঢাকায় চলে যাওয়ার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পরে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে শিশুটির দায়িত্ব নেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হাবিবুল্লাহ। তিনি শিশুটির তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা, খাবার ও প্রয়োজনীয় পোশাকের ব্যবস্থা করেন।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১৪ নম্বর বারইখালী ইউনিয়নের জেলে পাড়া এলাকার একটি ইটভাটার পাশে শিশুটিকে একা অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয়রা। শিশুটির কান্না শুনে তারা এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। পরে শিশুটিকে তার দাদির কাছে নিয়ে যাওয়া হলেও পারিবারিক বিচ্ছেদের কারণে দাদি তাকে দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান বলে জানা গেছে।
এ অবস্থায় স্থানীয়রা বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করেন এবং শিশুটিকে নিয়ে ইউএনও মো. হাবিবুল্লাহর বাসভবনে যান। বিষয়টি জানতে পেরে ইউএনও তাৎক্ষণিকভাবে শিশুটিকে নিজের হেফাজতে নেন। শিশুটির প্রয়োজনীয় পোশাক ও খাবারের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন তিনি।

শিশুটির নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই এখন আমাদের প্রধান দায়িত্ব। আইন ও মানবিকতার দিক বিবেচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিশুটির বাবা মো. পলাশ ও মা মিতু আক্তারের মধ্যে প্রায় তিন মাস আগে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকেই শিশুটি পারিবারিক অবহেলার মধ্যে ছিল। সর্বশেষ শিশুটিকে সড়কের পাশে একা রেখে মায়ের চলে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দেয়।
তবে শিশুটিকে ফেলে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও প্রশাসনিক তদন্তের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে মায়ের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা আইনি সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ঘটনার পর ইউএনও শিশুটির বাবা মো. পলাশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জানা গেছে, তিনি বর্তমানে কর্মস্থলের কারণে এলাকার বাইরে অবস্থান করছেন। প্রশাসনের উদ্যোগে তিনি আগামী সোমবার সশরীরে উপস্থিত হয়ে সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এদিকে, শিশুটির সাময়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউএনও তাকে তার ফুফু রেসমা খাতুনের কাছে হস্তান্তর করেছেন। পাশাপাশি তিন দিনের ভরণ-পোষণের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, আগামী সোমবারের শুনানিতে শিশুটির আইনগত অভিভাবকত্ব, ভরণ-পোষণ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। শিশুটিকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে যাওয়ার ঘটনায় কারও আইনগত দায় থাকলে সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, পারিবারিক বিরোধ বা বিচ্ছেদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হয়ে পড়ে শিশুরা। বাবা-মায়ের সম্পর্কের টানাপোড়েনের দায় কোনো শিশুর নয়। অথচ অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ে তাদের জীবন ও মানসিক বিকাশের ওপর।
মোরেলগঞ্জের এ ঘটনাও সেই বাস্তবতার একটি করুণ উদাহরণ। মাত্র দুই বছরের একটি শিশুর নিজের নিরাপত্তা কিংবা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। তার প্রয়োজন ছিল পরিবারের নিরাপদ আশ্রয় ও যত্ন। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের এগিয়ে আসা এবং উপজেলা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ শিশুটির জন্য সাময়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপে শিশুটির জন্য শুধু তাৎক্ষণিক আশ্রয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ পরিবেশ, সঠিক অভিভাবকত্ব ও প্রয়োজনীয় যত্ন নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে শিশুটিকে কেন্দ্র করে বাবা-মায়ের পারিবারিক বিরোধ থাকলে তা যেন তার ভবিষ্যৎ জীবনে আরও নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
একটি শিশুর নিরাপত্তা শুধু তার পরিবারের দায়িত্ব নয়; প্রয়োজনে রাষ্ট্র ও সমাজকেও তার পাশে দাঁড়াতে হয়। মোরেলগঞ্জের এই ঘটনায় স্থানীয়দের মানবিক উদ্যোগ এবং উপজেলা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ সেই দায়িত্ববোধেরই একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

