
দুর্গন্ধ পেয়ে বেড়ার ফাঁক দিয়ে লাশ দেখতে পান পথচারীরা; স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে অসহায় পরিবার
কুমিল্লার দেবীদ্বারে একটি পরিত্যক্ত বাড়ির ঘর থেকে ইউছুফ আলী (৩২) নামে এক যুবকের অর্ধগলিত ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেলে উপজেলার ধামতী গ্রামের পশ্চিমপাড়ার আবু তাহেরের পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়দের বরাতে জানা গেছে, বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত থাকায় সেখানে খুব একটা মানুষের যাতায়াত ছিল না। শনিবার বিকেলে ওই এলাকার পথচারীরা বাড়ির আশপাশে তীব্র দুর্গন্ধ পান। পরে টিনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতরে উঁকি দিয়ে একজন যুবককে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তারা। বিষয়টি স্থানীয়দের জানালে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
খবর পেয়ে দেবীদ্বার সার্কেলের সিনিয়র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহীন ও দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মো. ইমাম হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
নিহত ইউছুফ আলী (৩২) কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার রামমোহন ইউনিয়নের কাপালনগর গ্রামের আয়েত আলীর ছেলে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেবীদ্বার এলাকায় অটোরিকশা চালাতেন এবং প্রায় ৭-৮ মাস মাছের ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
স্থানীয়রা জানান, ইউছুফ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় তার পারিবারিক জীবনে দীর্ঘদিন ধরে অশান্তি চলছিল। প্রায় ১৫ দিন আগে মাদক সেবন করে স্ত্রীকে মারধর করার পর তার স্ত্রী দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান। এরপর থেকে ইউছুফ একাই ওই পরিত্যক্ত বাড়িতে ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান।
“নিহতের স্ত্রী পান্না আক্তার ২০২০ সাল থেকে কুমিল্লা ইপিজেডে চাকরি করতেন। ইউছুফ তাকে পছন্দ করে বিয়ের জন্য প্রায় এক বছর ধরে চেষ্টা করেন। পরে ২০২১ সালে তাদের বিয়ে হয়। তাদের দুই ছেলে রয়েছে এবং পান্না বর্তমানে চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামী মাদকাসক্ত হওয়ায় সংসারে নানা অশান্তি চলছিল। তারপরও তিনি স্বামীকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন এবং বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন।”
— বিউটি আক্তার, সদস্য, ১০ নম্বর গুনাইঘর দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ।
ইউপি সদস্য আরও জানান, পান্না আক্তার ভালো পরিবারের সন্তান। স্বামীর সঙ্গে ভাড়া বাসায় থেকে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের দেখাশোনা করতেন। স্বামীর মাদকাসক্তির কারণে পারিবারিকভাবে নানা সমস্যার সৃষ্টি হলেও তিনি সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন।
পরিত্যক্ত বাড়িটির মালিক আবু তাহের জানান, তিনি দেবীদ্বার সদরের ‘লিপি ২২ ক্যারেট জুয়েলার্স’ দোকানে ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করেন। চাকরির কারণে পরিবার নিয়ে দেবীদ্বার সদরে ভাড়া বাসায় থাকেন। তার বাড়িটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় পাশের বাড়ির মৃত কুদ্দুস মিয়ার স্ত্রীর অনুরোধে ইউছুফ আলীকে সেখানে একটি ঘরে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি বাড়িটি দেখভালের দায়িত্বও তাকে দেওয়া হয়। শনিবার সন্ধ্যায় ঘটনার খবর পেয়ে তিনি বাড়িতে আসেন।
“ইউছুফ আলী প্রায় তিন বছর ধরে এ এলাকায় থাকতেন। আমার গ্যারেজ থেকে অটোরিকশা ভাড়া নিয়ে তিনি চালাতেন। আবু তাহেরের বাড়িতে থাকার আগে আসাদ, মধু ও মতিন সরকারের বাড়িতেও ভাড়া থাকতেন। অটো চালিয়েই তিনি সংসার চালাতেন।”
— মোশাররফ হোসেন, ধামতী বাজারের সিএনজি ও অটোরিকশা গ্যারেজ মালিক।
নিহতের স্ত্রী পান্না আক্তার জানান, তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন। মাদক সেবনের পর প্রায়ই তাকে মারধর করতেন। স্বামীর আয়ের বড় একটি অংশ মাদকের পেছনে চলে যাওয়ায় সংসারে চরম সংকট দেখা দেয়। সন্তানদের নিয়ে সংসার চালাতে তাকেও বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ভিক্ষা করতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
“আমার স্বামী নেশা করে আমাকে মারধর করতেন। বর্তমান বাসায় প্রায় তিন মাস আগে উঠেছিলাম। সেখানে তিনি দলবল নিয়ে মদ, গাঁজা ও ইয়াবা সেবন করতেন। বাধা দিলে আমাকে মারধর করতেন। তারপরও আমি স্বামীকে আগলে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। চাকরি জীবনের উপার্জন তাকে ব্যবসার জন্য দিয়েছি, আমার বাবা-ভাই-বোনের কাছ থেকেও টাকা এনে দিয়েছি। কিন্তু সবই নেশার পেছনে শেষ হয়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রায় ১৫ দিন আগে মাদকের কারণে আমি বাবার বাড়িতে চলে আসি। যাওয়ার সময় আমার মোবাইলও ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর তার সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। আজ সন্ধ্যায় জানতে পারি, কয়েক দিন আগে আমার স্বামী আত্মহত্যা করেছেন। এখন দুই অবুঝ সন্তান ও গর্ভের চার মাসের সন্তানকে নিয়ে আমি কীভাবে বাঁচব—সেটাই বুঝতে পারছি না।”
পুলিশ জানিয়েছে, ইউছুফের লাশের অবস্থার কারণে ধারণা করা হচ্ছে, কয়েক দিন আগে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
“নিহত ইউছুফ নেশাগ্রস্ত ছিলেন এবং মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে পারিবারিক বিরোধ ছিল। তবে ঠিক কী কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছেন, তা তদন্তের আগে বলা সম্ভব নয়। লাশের অবস্থা দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তিন-চার দিন আগে তিনি পরিত্যক্ত বাড়ির ঘরের তীরের সঙ্গে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন।”
— মো. মনিরুজ্জামান, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, দেবীদ্বার থানা।
পুলিশ জানায়, লাশ উদ্ধারের পর প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে পরবর্তী আইনি কার্যক্রম ও ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

