
বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘিতে দীর্ঘদিনের আলোচিত কুমির ধলাপাহাড় এখন কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে। মাজারের দিঘি থেকে উদ্ধারের পর দীর্ঘ দুই মাস নয় দিন কোনো খাবার না খেয়ে থাকা কুমিরটি নতুন পরিবেশে গিয়ে অবশেষে খাবার গ্রহণ করেছে। এতে স্বস্তি ফিরেছে বন বিভাগের কর্মকর্তা ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।
গত ১২ আগস্ট বন অধিদপ্তরের বিশেষ অনুমোদনে ধলাপাহাড়কে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে স্থানান্তর করা হয়।

নতুন পরিবেশে খাবার গ্রহণ করায় ধলাপাহাড়ের শারীরিক অবস্থার উন্নতি ও স্বাভাবিক আচরণে ফেরার ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী ধলাপাহাড়ের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ৭ থেকে ৮ ফুট এবং ওজন ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি। গত ৩ জুন বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘি থেকে কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছিল।
উদ্ধারের পর থেকেই ধলাপাহাড়কে ঘিরে তৈরি হয় নতুন উদ্বেগ। দীর্ঘ সময় পার হলেও কুমিরটি কোনো খাবার গ্রহণ করছিল না। প্রায় দুই মাস নয় দিন খাবার না খাওয়ায় তার স্বাস্থ্য নিয়ে শঙ্কা দেখা দেয়। তবে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কুমির শীতল রক্তের প্রাণী হওয়ায় দীর্ঘ সময় খাবার ছাড়াই শরীরে সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করে বেঁচে থাকতে পারে।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল জানান, দীর্ঘ সময় খাবার না খেলেও ধলাপাহাড়ের শারীরিক অবস্থার বড় ধরনের অবনতি হয়নি। পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং বন্দিদশার মানসিক চাপের কারণে কুমিরটি স্বাভাবিক আচরণ থেকে বিরত ছিল বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
জননিরাপত্তার প্রশ্নেই দিঘি ছাড়তে হয় ধলাপাহাড়কে
ধলাপাহাড়ের নতুন ঠিকানায় যাওয়ার পেছনে শুধু তার নিরাপদ আবাসনের বিষয় নয়, জড়িয়ে আছে মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নও।
গত ১ জুন খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘিতে গোসল করতে নামা আট বছর বয়সী এক শিশুকে আক্রমণ করে হত্যা করে কুমিরটি। এর আগে একটি কুকুরকেও আক্রমণ করে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটে। পরপর এসব ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
মাজারের দিঘিটি ধর্মীয় ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হওয়ায় সেখানে প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল রয়েছে। ফলে এমন একটি আক্রমণাত্মক কুমিরের উপস্থিতি স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছিল।
স্থানীয়দের পক্ষ থেকে কুমিরটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জোরালো হওয়ার পর বন বিভাগ জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ধলাপাহাড়কে উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়।
দীর্ঘ অনশনেও ভেঙে পড়েনি শারীরিক সক্ষমতা
খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকার সময় ধলাপাহাড়ের শারীরিক পরীক্ষা করেন চিকিৎসক ডা. জুলকারনাইন। পরীক্ষায় তার শারীরিক অবস্থায় উদ্বেগজনক কোনো অবনতি পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কুমিরের বিপাকক্রিয়া তুলনামূলক ধীর। ফলে শরীরে জমা চর্বি ও শক্তি ব্যবহার করে তারা দীর্ঘ সময় খাবার ছাড়াই টিকে থাকতে পারে। তবে দীর্ঘদিন খাবার না খাওয়ার পর নতুন পরিবেশে স্থানান্তরের ফলে প্রাণীটির আচরণ ও শারীরিক অবস্থার ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন ছিল।
নতুন ঠিকানায় গিয়েই খাবার খেল ধলাপাহাড়
ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে পৌঁছানোর পর ধলাপাহাড়ের আচরণে দেখা দিয়েছে ইতিবাচক পরিবর্তন। পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মঞ্জুরুল আলম জানান, নতুন পরিবেশে পৌঁছানোর পরদিনই কুমিরটি একটি জীবিত মুরগি খেয়েছে।
দীর্ঘ ২ মাস ৯ দিন খাবার না খাওয়ার পর ধলাপাহাড়ের এভাবে খাবার গ্রহণকে ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে ধারণা করা হচ্ছে, নতুন পরিবেশের সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে শুরু করেছে কুমিরটি।
সাফারি পার্কের নিয়ম অনুযায়ী, কুমিরকে সপ্তাহে একদিন খাবার সরবরাহ করা হয়। নতুন পরিবেশে ধলাপাহাড়ের খাদ্যাভ্যাস ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী তার পরিচর্যা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
২০০৫ সালে ভারত থেকে আসা কুমিরদের শেষ জীবিত সদস্য
ধলাপাহাড়কে ঘিরে আরও একটি বিশেষ তথ্য রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে ভারত থেকে আনা কুমিরগুলোর মধ্যে বর্তমানে ধলাপাহাড়ই একমাত্র জীবিত সদস্য।
এ কারণে সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ কুমিরটির প্রতি বিশেষ নজর রাখছে। তার বয়স, আকার এবং দীর্ঘদিনের ইতিহাস বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্য ও আচরণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা হয়েছে।
ধলাপাহাড়ের স্থানান্তর শুধু একটি বন্যপ্রাণীকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
জনবসতি থেকে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসনে
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক আবাসস্থল থেকে বিচ্যুত হয়ে কোনো বন্যপ্রাণী যখন জনবসতিতে চলে আসে, তখন একই সঙ্গে প্রাণী এবং মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি হয়। ধলাপাহাড়ের ঘটনাও তার একটি বড় উদাহরণ।
একদিকে মাজারের দিঘিতে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি ছিল, অন্যদিকে কুমিরটির জীবনও রক্ষা করা প্রয়োজন ছিল। হত্যা বা নিধনের পরিবর্তে নিরাপদ পরিবেশে স্থানান্তরের মাধ্যমে উভয় দিক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে ধলাপাহাড় খাবার গ্রহণ করছে এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তার এই পরিবর্তন বন বিভাগের উদ্যোগকে আশাব্যঞ্জক করে তুলেছে।
বাগেরহাটের একটি জনবহুল দিঘি থেকে শুরু করে কক্সবাজারের সাফারি পার্ক—ধলাপাহাড়ের এই দীর্ঘ যাত্রা এখন শুধু একটি কুমিরের গল্প নয়; এটি মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত কমিয়ে নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করারও একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

