

বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির কিংবদন্তি, ভাষাসৈনিক, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীও অনেকটা নীরবতা ও অনাড়ম্বরতার মধ্য দিয়ে পার হয়েছে।
গণমানুষের অধিকার, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে আজীবন সোচ্চার থাকা এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ২০১৯ সালের ২৩ আগস্ট ৯৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামের কৃতী সন্তান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মৃত্যুবার্ষিকীতে এ বছরও বড় কোনো আয়োজন দেখা যায়নি। তাঁর রাজনৈতিক দল ন্যাপ কিংবা নিজ জন্মভূমির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের পক্ষ থেকেও ছিল সীমিত আয়োজন।

অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মতো ত্যাগী ও আদর্শবান নেতার মৃত্যুবার্ষিকী আরও মর্যাদার সঙ্গে পালিত হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু স্থানীয়ভাবে তেমন কোনো আয়োজন হয়নি।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এলাহাবাদে তাঁর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ন্যাপ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠন, দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব এবং মোজাফ্ফর-মনিসিং গ্রন্থাগারের প্রতিনিধিরা।
তবে স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দুপুর ১২টা পর্যন্ত এসব সংগঠনের বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তাঁর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে দেখা যায়নি। এমনকি তাঁর স্মৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ’, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের প্রতিষ্ঠিত কলেজ এবং তাঁর বাবা প্রতিষ্ঠিত এলাহাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন চোখে পড়েনি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এ উপলক্ষে কোনো স্মরণসভা, আলোচনা, দোয়া বা স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—যে মানুষটি জীবনের পুরোটা সময় গণমানুষের অধিকার ও দেশের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর স্মৃতি রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের এই নীরবতা কেন?
প্রবীণ ন্যাপ নেতা ও বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা মুস্তাকুর রহমান ফুলমিয়া মাস্টার বলেন, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে উপজেলা ন্যাপের পক্ষ থেকে স্মরণসভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে তাঁকে কেউ কিছু জানাননি।
ন্যাপ উপজেলা সভাপতি অনিল ঠাকুর বলেন, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এবার আলোচনা সভা বা দোয়ার আয়োজন করা হয়নি। তবে প্রতিবছরের মতো তাঁর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।
ন্যাপ কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ছিদ্দিকুর রহমান জানান, দলের সভাপতি আইভি রহমান অসুস্থ থাকায় এবার ব্যাপক কর্মসূচি পালন করা সম্ভব হয়নি। তবে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রয়াত নেতার প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর কর্মসূচি থাকবে।
এলাহাবাদ কলেজের অফিস সহকারী এবং অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের বাড়ির কেয়ারটেকার ন্যাপ নেতা মো. আবুল কাসেম বলেন, স্থানীয়ভাবে এবার তেমন কোনো আয়োজন হয়নি। সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে আসা লোকজনের সংখ্যাও ছিল খুবই কম। তাঁর মতে, এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের অবহেলাও দায়ী।
অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ভূঁইয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা কেয়াম উদ্দিন ভূঁইয়া ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক এবং এলাহাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। মা আফজারুন্নেছা ছিলেন গৃহিণী।
বাবার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে ভর্তির মধ্য দিয়েই তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। হোসেনতলা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জাফরগঞ্জ রাজ ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনা শেষে দেবীদ্বার রেয়াজ উদ্দিন সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৩৭ সালে মাধ্যমিক এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে ভর্তি হয়ে প্রথম বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরিসংখ্যান বিষয়েও ইউনেস্কোর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করা অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতির দিকে নিয়ে যায়।
১৯৩৭ সালে কুমিল্লার চান্দিনা গরুর বাজারে ব্রিটিশবিরোধী এক জনসভায় মহাত্মা গান্ধীর বক্তব্যের মর্মার্থ অনুসন্ধান করতে গিয়ে তিনি অবিভক্ত ভারতের নিষিদ্ধ বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত হন। সেখান থেকেই তাঁর বাম রাজনীতিতে হাতেখড়ি।
১৯৫১-৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকা কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন তিনি। আজিমপুর কলোনির ৮/আই নম্বর সরকারি বাসভবনটি সে সময় প্রগতিশীল, কমিউনিস্ট ও বামপন্থী নেতাদের গোপন বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল বলে রাজনৈতিক ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
নেপাল নাগ, খোকা রায়, অনিল মুখার্জি ও সত্যেন সেনসহ তৎকালীন অনেক প্রগতিশীল নেতা সেখানে বৈঠক করতেন। ভাষা আন্দোলনের কৌশল, লিফলেট তৈরি এবং পরবর্তীতে যুক্তফ্রন্টের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়েও সেখানে আলোচনা হতো।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে দেবীদ্বার আসন থেকে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন তরুণ অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ।
১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে তিনি আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। একই বছর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হলে তিনি দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে আসেন।
১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারির পর অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও হুলিয়া জারি করা হয়। তাঁকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণার কথাও রাজনৈতিক ইতিহাসে উল্লেখ আছে।
এরপর দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থেকে তিনি আন্দোলন সংগঠিত করেন। কখনো ফেরিওয়ালা, কখনো তরকারি বিক্রেতা, কখনো ফল বিক্রেতা কিংবা কৃষকের ছদ্মবেশে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। প্রায় আট বছর পর তিনি প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাজউদ্দীন আহমদকে আহ্বায়ক করে গঠিত মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের ছয় সদস্যের উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি।
ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের নিয়ে গঠিত বিশেষ গেরিলা বাহিনী সংগঠিত করতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদেও তিনি বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য ও কূটনৈতিক তৎপরতায় অংশ নেন। স্বাধীনতার পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের সমর্থন আদায়েও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
২০১৫ সালে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে তিনি তা বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন।
তাঁর বক্তব্য ছিল—রাজনীতির অর্থ দেশ ও মানুষের সেবা। পদ বা পদবির জন্য তিনি রাজনীতি করেননি। দেশপ্রেম ও মানবতাবোধ থেকেই রাজনীতিতে এসেছিলেন। এমনকি স্বাধীনতার পর মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাবও তিনি গ্রহণ করেননি।
নীতির প্রশ্নে আজীবন আপসহীন এই রাজনীতিক নিজের রাজনৈতিক জীবনকে কখনো ব্যক্তিগত প্রাপ্তির জন্য ব্যবহার করেননি—এমনটাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও সহকর্মীদের মূল্যায়ন।
সাধারণ মানুষের জীবন-সংগ্রামকে সহজ ভাষায় তুলে ধরতে তিনি প্রায়ই রসিকতা ও কৌতুকের আশ্রয় নিতেন। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলতেন—‘আমার নাম মোজাফ্ফর আহমদে নূরী, আমি পথে পথে ঘুরি।’
গণমানুষের দারিদ্র্য ও বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরতে তাঁর বহুল ব্যবহৃত কথার মধ্যে ছিল—‘ভর্তার নিচে তরকারি নাই, নেংটির নিচে কাপড় নাই, চকিদারের নিচে চাকরি নাই।’
তাঁর লেখার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—‘সমাজতন্ত্র সম্পর্কে জানার কথা’ প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, ‘কিছু কথা’, ‘মুক্তির পথ’ এবং ‘সময়ের কণ্ঠ’।
ব্যক্তিজীবনে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ ছিলেন এক কন্যাসন্তানের জনক। তাঁর একমাত্র কন্যা আইভি রহমান বর্তমানে ন্যাপ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁর প্রয়াত স্ত্রী আমিনা আহমদ ছিলেন ভাষাসৈনিক, ইডেন কলেজের সাবেক ভিপি, সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং ন্যাপ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন, বুলগেরিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ভারত, লিবিয়া, আফগানিস্তান, দক্ষিণ ইয়েমেনসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেন।
দেবীদ্বারের এলাহাবাদের মাটিতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি পরিণত হয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রাম, ত্যাগ, আদর্শ ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ অভিযাত্রা।
আজ তাঁর মৃত্যুর সাত বছর পরও প্রশ্ন থেকে যায়—যে নেতার রাজনৈতিক জীবনজুড়ে ছিল মানুষের জন্য লড়াই, তাঁর জন্মভূমিতেই কেন তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী ক্রমেই আনুষ্ঠানিকতা হারাচ্ছে? ইতিহাসের এই মানুষটির স্মৃতি সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর আদর্শ তুলে ধরার দায়িত্ব কি শুধু কয়েকটি সংগঠনের ওপরই থাকবে?