

কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় অবৈধ ড্রেজার দিয়ে কৃষিজমির উর্বর মাটি কাটা, অবৈধ ইটভাটায় সেই মাটি ব্যবহার, কৃষিজমি ধ্বংস এবং পরিবেশ বিপর্যয় রোধে এবার প্রশাসনের ওপর আরও কঠোর নজরদারি আরোপ করলেন হাইকোর্ট। অবৈধ ড্রেজার ও মাটি কাটার যন্ত্রপাতি জব্দ, অবৈধ ব্রিক ফিল্ড বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি ও বালুর গর্ত তদন্ত এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট ২০২৬) বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঁইয়ার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এ নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দেন বলে রিটকারীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
আদালতের নির্দেশনায় কুমিল্লার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি), মুরাদনগর থানা ও বাঙ্গরা বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিষয়টি বাস্তবায়ন করে আদালতে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।
হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জন্য বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।
১. কৃষিজমি ও নদী থেকে উর্বর মাটি কাটায় ব্যবহৃত ড্রেজারসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি জব্দ করতে হবে।
২. অবৈধ ব্রিক ফিল্ড বা ইটভাটা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. ড্রেজার দিয়ে মাটি কাটার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত আবাদি জমি ও সৃষ্ট বালুর গর্তগুলো তদন্ত করতে হবে।
৪. কৃষিজমি রক্ষায় সময়সীমা নির্ধারণ করে বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
৫. ড্রেজার ও ইটভাটার জন্য মাটি কাটার ফলে সৃষ্ট গর্তগুলো পুনরায় আবাদযোগ্য জমিতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬. নদী ও কৃষিজমি থেকে মাটি কাটার কাজে ব্যবহৃত ড্রেজার, ভেকু ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি জব্দ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
৭. এলাকায় নিয়মিত পেট্রোল ডিউটি পরিচালনার মাধ্যমে নদী ও আবাদি জমি থেকে মাটি কাটা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৮. মাটি কাটার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও আদালতে প্রেরণের উদ্যোগ নিতে হবে।
রিটকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুরাদনগরে কৃষিজমির উর্বর মাটি কেটে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন, অবৈধ ব্রিক ফিল্ডে মাটি সরবরাহ, কৃষিজমি ভরাট করে আবাসন নির্মাণসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে প্রতিবাদ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়ে আসছিল।
কৃষি ও পরিবেশ ফাউন্ডেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবুল কালাম আজাদ ওরফে উজ্জল জানান, কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুরাদনগর উপজেলার পিপড়িয়া ঈদগাহ মাঠে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় করণীয় বিষয়ে আলোচনা করা হয়। এরপর এলাকাবাসীর মতামতের ভিত্তিতে তিনি বছরব্যাপী সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যান।
তিনি দাবি করেন, প্রশাসনের সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ই-মেইল ও ডাকযোগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রায় ৬০টি চিঠি দেওয়া হয়।
এরপর অবৈধ ড্রেজার, ব্রিক ফিল্ড, কৃষিজমির উর্বর মাটি কেটে ইটভাটায় ব্যবহার এবং কৃষিজমি ভরাট করে আবাসন গড়ে তোলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিগ্যাল নোটিশ ও পরবর্তীতে ডিমান্ড অব জাস্টিস নোটিশ দেওয়া হয়।
রিটকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব নোটিশের পরও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নং ১৪১০৮/২০২২ দায়ের করা হয়। রিটে কৃষি ও পরিবেশ ফাউন্ডেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবুল কালাম আজাদ ওরফে উজ্জল এবং আইন ও মানবাধিকার সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন জুয়েল আবেদনকারী ছিলেন।
রিটকারীর দাবি, এর আগে ২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বর হাইকোর্ট মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে অবৈধ ড্রেজার ও ব্রিক ফিল্ড বন্ধ, কৃষিজমির উর্বর মাটি কেটে ইটভাটায় ব্যবহার বন্ধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তদন্ত করে গর্তগুলো ভরাটের জন্য কর্মপরিকল্পনাসহ ৬০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
একইসঙ্গে কুমিল্লার পুলিশ সুপার, মুরাদনগর থানা ও বাঙ্গরা বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কৃষিজমি ও নদী থেকে মাটি কাটায় ব্যবহৃত অবৈধ ড্রেজার, ভেকুসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি জব্দ, নিয়মিত পেট্রোল ডিউটি এবং মাটি কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে রিটকারীর পক্ষ থেকে জানানো হয়।
তবে ওই নির্দেশনার আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণ, কর্মপরিকল্পনা ও অগ্রগতির প্রতিবেদন আদালতে যথাসময়ে দাখিল করা হয়নি বলে অভিযোগ রিটকারীর।
রিটকারীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষার বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধানের ১৬, ১৮ক, ২১(১) ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সম্পর্কিত। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবাদি জমি রক্ষা এবং কৃষিজমির উর্বর মাটি অবৈধভাবে কেটে নেওয়া বন্ধ করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ বলেও দাবি করা হয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি জানানো হলেও অসাধু মাটি ব্যবসায়ীরা বিভিন্নভাবে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন। স্থানীয় সাংবাদিকরাও বিভিন্ন সময়ে এসব বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে মুরাদনগরে জনস্বার্থে ব্যবহৃত একটি সরকারি রাস্তার গতিপথ পরিবর্তনের অভিযোগ নিয়েও নতুন করে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জনগণের চলাচলের জন্য ব্যবহৃত সরকারি রাস্তার গতিপথ পরিবর্তন করে দেওয়ায় পথচারী ও এলাকাবাসী ভোগান্তিতে পড়েছেন।
এ ঘটনায় স্থানীয় জনগণ গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক, মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত করা হলে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে স্থানীয়দের দাবি। কিন্তু তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পরও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ও নিয়মিত ওই পথ ব্যবহারকারী মানুষজন।
স্থানীয় পথচারীদের অভিযোগ, একদিকে কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষায় আদালতের নির্দেশনা রয়েছে, অন্যদিকে জনগণের চলাচলের সরকারি রাস্তার গতিপথ পরিবর্তনের অভিযোগ তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পরও যদি কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ প্রতিকার পাবে কোথায়—এ প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
তাদের দাবি, সরকারি রাস্তার মূল গতিপথ, জমির রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং জনগণের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা হোক।
রিটকারী অ্যাডভোকেট মো. আবুল কালাম আজাদ ওরফে উজ্জল বলেন, মুরাদনগরের কৃষিজমি রক্ষায় হাইকোর্টের নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবৈধ ড্রেজার ও ব্রিক ফিল্ড বন্ধের পাশাপাশি ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হলে কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় এটি কার্যকর পদক্ষেপ হবে।
তিনি বলেন, শুধু আদালতের নির্দেশনা জারি হলেই হবে না; নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, কারা দায়িত্ব পালন করছেন এবং কোথায় ব্যর্থতা রয়েছে—তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
রিটকারীর পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, মুরাদনগরের কৃষিজমি রক্ষা, অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত জমি পুনরুদ্ধার এবং জনগণের চলাচলের সরকারি রাস্তা সুরক্ষায় প্রশাসনের দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।