
ভরা মৌসুমেও বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম। ফলে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে জাতীয় মাছ ইলিশ। কাঙ্ক্ষিত মাছ না পেয়ে অনেক জেলেই ফিরছেন খালি হাতে। অন্যদিকে জেলেদের দাদন দেওয়া আড়তদার ও মহাজনরাও পড়েছেন লোকসানের মুখে।
বর্ষার ভরা মৌসুমের প্রায় দুই মাস শেষ হতে চললেও বাজারে ইলিশের তেমন দেখা মিলছে না। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তার বেশির ভাগই আগের তুলনায় আকারে ছোট। সরবরাহ কম থাকায় দামও সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ফলে ভরা মৌসুমেও অনেকের পাতে উঠছে না প্রিয় ইলিশ।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নদীতে নাব্যতা সংকট, দূষণ, প্রজনন পরিবেশের অবনতি এবং অবাধে জাটকা নিধনের কারণে দিন দিন ইলিশের উৎপাদন কমছে। গবেষকদের মতে, একসময় যেখানে ইলিশের গড় ওজন ছিল ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম, বর্তমানে তা কমে ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রামের মধ্যে নেমে এসেছে।

ভরা মৌসুমেও ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ইলিশের স্বাভাবিক প্রজনন ও জীবনচক্র রক্ষা করতে নিষিদ্ধ জাল, জাটকা ও মা-ইলিশ শিকার বন্ধের পাশাপাশি নদী ও সমুদ্রের পরিবেশ রক্ষা জরুরি।
বর্ষাকালকে ইলিশের প্রধান মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশে আহরিত মোট ইলিশের প্রায় ৭০ শতাংশই আসে দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও সাগর থেকে। তবে গত কয়েক বছর ধরে উৎপাদন বৃদ্ধির হার কমে আসছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৫ দশমিক ৩২ লাখ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৫০ লাখ টনে। ২০২০-২১ সালে ৫ দশমিক ৬৫ লাখ, ২০২১-২২ সালে ৫ দশমিক ৬৬ লাখ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে ৫ দশমিক ৭১ লাখ টনে পৌঁছায়। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে প্রায় পাঁচ লাখ টনে নেমে এসেছে।
শুধু উৎপাদন ও সরবরাহ নয়, আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে ইলিশের আকারও। ইলিশ গবেষক ও বাংলাদেশ মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, গত দুই বছর ধরে ইলিশের সামগ্রিক উৎপাদন কমছে। একই সঙ্গে মাছের আকারও ছোট হয়ে আসছে। একসময় ইলিশের গড় ওজন ৪০০-৪৫০ গ্রাম থাকলেও এখন তা ৩০০-৩৫০ গ্রামে নেমে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নদীদূষণ, নাব্যতা সংকট এবং প্রজনন পরিবেশের অবনতির ফলে ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি উত্তরণে নদী ও জলজ পরিবেশ রক্ষা এবং কার্যকর গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, একটি ইলিশ এক থেকে দেড় কেজি ওজনের হতে অন্তত দেড় বছর সময় লাগে। নদীতে ডিম ফুটে জন্ম নেওয়া বাচ্চা ইলিশ সাগরে যায় এবং বড় হয়ে আবার ডিম ছাড়ার জন্য মিঠাপানিতে ফিরে আসে। কিন্তু অতিরিক্ত মাছ শিকারের কারণে ইলিশের এই স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মোহনায় নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, শিল্প-কারখানার দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো নির্মাণ নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও মাছের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি সাগরে ট্রলিং জাহাজের মাধ্যমে মা-ইলিশ ও জাটকা শিকারের কারণেও বড় ইলিশের সংকট তৈরি হচ্ছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান থাকলেও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না।
এদিকে বাজারে ছোট আকারের ইলিশের সরবরাহও কম। দীর্ঘদিন হিমায়িত করে রাখা মাছ বাজারে বিক্রি এবং সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দামে ইলিশ বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
বাজারে ইলিশ কিনতে আসা ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক কেজি ইলিশের জন্য ৩ হাজার ৫০০ টাকা খরচ করার সামর্থ্য সাধারণ মানুষের নেই। একসময় বাঙালির ঘরে ঘরে থাকা ইলিশ এখন যেন ধনীদের খাবারে পরিণত হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, ভরা মৌসুমেও যদি ইলিশের দাম এত বেশি থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ এই মাছ কিনবে কীভাবে? বাজার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর তদারকিও চোখে পড়ছে না।
খুচরা ব্যবসায়ীরা ইলিশের চড়া দামের পেছনে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত হাতবদল ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন। তাদের দাবি, আহরণ থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত ইলিশ কয়েক দফা হাতবদল হয়। প্রতিটি ধাপেই যুক্ত হয় নতুন খরচ ও মুনাফা। এর সঙ্গে দাদন, বরফ, জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মাছ আহরণের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অন্যদিকে অধিক লাভের আশায় অনেক ব্যবসায়ী ইলিশ ফ্রিজিং করে সংরক্ষণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এক ব্যবসায়ী জানান, সরবরাহ কম থাকায় আগের বছরের সংরক্ষিত ‘হিম ইলিশ’ও এখন বাজারে ছাড়া হচ্ছে।
বর্তমানে বাজারে ৩০০-৪০০ গ্রামের ছোট ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা দরে। এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং দেড় কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকায়।
তবে দীর্ঘদিন ফ্রিজিং করে রাখা ইলিশের গুণগত মান ও পুষ্টিমান নিয়ে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা মাছের মান কমে যেতে পারে এবং যথাযথভাবে সংরক্ষণ না হলে খাদ্যজনিত অসুস্থতার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
ইলিশ সংকটের প্রভাব পড়েছে সরকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতেও। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) আওতায় সারা দেশে থাকা ২০টি কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি বন্ধ এবং নয়টি কোনোরকমে কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
খুলনা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরের মধ্যে চলতি মৌসুমেই সেখানে ইলিশের সরবরাহ সবচেয়ে কম। চলতি জুলাই পর্যন্ত ভরা মৌসুমে ওই কেন্দ্রে এসেছে মাত্র দেড় হাজার কেজি ইলিশ। অথচ ২০২২ সালের জুলাইয়ে এসেছিল ৩৮ হাজার ৫৪৬ কেজি, ২০২৩ সালে ১৫ হাজার ৯৭৬ কেজি এবং ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৩৯১ কেজি।
শুধু খুলনা নয়, দেশের অন্যান্য বড় মোকামেও ইলিশের আমদানি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষায় নিঝুম দ্বীপ, নাফ নদীসহ ছয়টি এলাকাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হলেও সেগুলো কার্যকরভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে ইলিশের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তাদের মতে, জাটকা ও মা-ইলিশ ধরা পুরোপুরি বন্ধ করা গেলে ইলিশের উৎপাদন আবারও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য মৎস্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ ও বিধিমালা, ১৯৮৫-এর যথাযথ প্রয়োগ, নিষিদ্ধ ট্রলিং বন্ধ, নদী ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ এবং জেলেদের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করে উপযুক্ত প্রণোদনা নিশ্চিত করা জরুরি।
নইলে একদিকে ইলিশের উৎপাদন ও আকার কমতে থাকবে, অন্যদিকে ভরা মৌসুমেও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যাবে বাঙালির ঐতিহ্যের এই প্রিয় মাছ।

