

যেখানে আইন তৈরির কারিগররা বসেন, সেখানেই আইনের তোয়াক্কা নেই—সচিবালয়ে ৩ সাপ পিটিয়ে হত্যা!
দেশের প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়েই যদি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন উপেক্ষিত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ আইন মানার শিক্ষা পাবে কীভাবে—এমন প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। সচিবালয়ের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের করিডোরে তিনটি সাপ দেখা দেওয়ার পর সেগুলো পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের ১৯তলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের করিডোরে প্রথমে দুটি এবং পরে আরও একটি সাপ দেখা যায়। এ তলাতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সচিবের দপ্তর রয়েছে।
সাপ দেখা দেওয়ার পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীরা তিনটি সাপই পিটিয়ে হত্যা করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। তবে সাপগুলো বিষধর ছিল কি না কিংবা কোন প্রজাতির—তা তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
বন্যপ্রাণী রক্ষায় রাষ্ট্রের কঠোর আইন রয়েছে। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ। ফলে সচিবালয়ের মতো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কোনো বন্যপ্রাণী দেখা দিলে সেটিকে হত্যা না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা বন বিভাগকে খবর দেওয়াই স্বাভাবিক ও আইনসম্মত পদ্ধতি।

সচিবালয়ের মতো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বন্যপ্রাণী হত্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কোনো প্রাণী হত্যা করার সুযোগ নেই। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সরকারকে তা স্পষ্ট করতে হবে।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, আতঙ্কের মধ্যেও সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী সংস্থা বা বন বিভাগকে খবর না দিয়ে সাপগুলো পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—আইন প্রয়োগের দায়িত্ব যাদের, তাদের কর্মস্থলেই যদি আইন অমান্যের ঘটনা ঘটে, তাহলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কার্যকারিতা কোথায়?
১৯তলার করিডোরে তিনটি সাপ কীভাবে প্রবেশ করল, সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভবনের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়েও এ ঘটনা নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কর্মকর্তাদের ধারণা, ভবনের স্টোরেজ কিংবা অন্য কোনো স্থানে আরও সাপ থাকতে পারে। ফলে শুধু সাপ হত্যার বিষয় নয়, এত উঁচু ভবনে সাপের উপস্থিতির কারণ অনুসন্ধান এবং ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, সাপ মানুষের জন্য আতঙ্কের কারণ হতে পারে; কিন্তু আতঙ্কের প্রতিক্রিয়ায় নির্বিচারে হত্যা কোনো সমাধান নয়। বিশেষ করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আইনসম্মত ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত।
সচিবালয়ে তিনটি সাপ পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের আওতায় কোনো তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কারণ সাধারণ মানুষকে যদি বলা হয়—‘আইন সবার জন্য সমান’, তাহলে সেই আইনের প্রথম পরীক্ষাও হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কেন্দ্রেই।