

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার টাটেরা গ্রামে বাবার ভিটায় প্রায় ২০ বছর ধরে শিকলবন্দী জীবন কাটাচ্ছেন আজাদ মিয়া (৪০)। পরিবারের দাবি, আজাদ মানসিকভাবে অসুস্থ। তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা এ দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিষয়টি তদন্ত করে তাকে শিকলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
আজাদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য মুছা মিয়ার চার সন্তানের মধ্যে ছোট। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ২০ বছর বয়স পর্যন্ত স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন তিনি। এরপর দুটি অপ্রীতিকর ঘটনার পর পরিবার তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ মনে করে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে।
বর্তমানে বাবার বাড়ির একতলা টিনশেড ভবনের একটি স্যাঁতসেঁতে ঘরে পায়ে শিকল দিয়ে রাখা হয়েছে আজাদকে। ঘরটিতে নেই খাট, বিছানা কিংবা বালিশ। অগোছালো চুল ও অপর্যাপ্ত পোশাকে দিন কাটছে তার। নাম জানতে চাইলে হাসিমুখে নিজের নাম ও বয়স ৪০ বছর বলে জানান তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আজাদের বয়স যখন ২০ বছর, তখন বাড়িতে কাজ করতে আসা আবদুল লতিফ নামে এক দিনমজুরের সঙ্গে তার তর্ক হয়। একপর্যায়ে আজাদ ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে আঘাত করেন বলে স্থানীয়রা জানান। পরে ওই আঘাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে তার একটি হাত কেটে ফেলতে হয়েছিল বলেও তারা দাবি করেন।
এর প্রায় দুই বছর পর বড় ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক বিরোধে জড়িয়ে তাকে মারধরের অভিযোগ ওঠে আজাদের বিরুদ্ধে। এরপর থেকেই পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে শিকলবন্দী করে রাখা হয় বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

একজন মানুষ মানসিকভাবে অসুস্থ হলে তাকে বছরের পর বছর শিকলে বেঁধে রাখা সমাধান নয়; প্রয়োজন সঠিক চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও মানবিক পুনর্বাসন।
তবে গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, আজাদ মানসিকভাবে সুস্থ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রামবাসী বলেন, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও একজন মানুষকে বছরের পর বছর শিকলে বেঁধে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আজাদকে প্রকৃতপক্ষে মানসিক রোগী কি না, তা যথাযথ চিকিৎসা ও পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
তবে পরিবারের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। আজাদের বড় ভাই ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য আমজাদ হোসেন বলেন, দুটি অপ্রীতিকর ঘটনার পর পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই তাকে শিকলে রাখতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
তিনি জানান, একসময় আজাদকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকেরা সুস্থ হওয়ার আশা কম বলে জানানোর পর নিয়মিত চিকিৎসা চালানো হয়নি। তবে সম্প্রতি কুমিল্লার একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞকে দেখানো হয়েছে। ওই চিকিৎসক কিছু পরীক্ষা দিয়েছেন এবং আগামী মাসে আবার দেখাতে বলেছেন।
বিষয়টি জানার পর সাহেবাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, তিনি ঘটনাটি জানতে পেরেছেন। সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি দেখবেন এবং প্রয়োজন হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় আজাদকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করবেন।
ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক হোসেন বলেন, বিষয়টি জানার পর আজাদের বাড়িতে পুলিশ পাঠিয়ে ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হবে। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও সামাজিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, এ বিষয়ে জানতে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্নী ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে কল ও খুদে বার্তার মাধ্যমে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।