প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩

হাসিনা যদি সত্যিই ফিরেন, নামবে লাখো মানুষ—সরকার রাখবে কোথায়?

হাসিনার ফেরার গুঞ্জন নয়, প্রস্তুতি কতটা—চাপে পড়বে সরকার?
আজকের কথা ডেস্ক :

শেখ হাসিনা ফিরলে সরকার সামলাবে কীভাবে?

ফেরার গুঞ্জনে রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ

শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি না—এ প্রশ্নকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ডিসেম্বরকে সম্ভাব্য সময়সীমা হিসেবে সামনে রেখে নানা আলোচনা, দাবি ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এসব দাবির সবকটির পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। ফলে বাস্তবতা ও গুজব—দুটিকে আলাদা করেই বিষয়টি দেখা জরুরি।

চলতি মাস শেষ হলেই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে কথিত ১২০ দিনের কাউন্টডাউন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই সময়সীমা শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি না—এমন একটি রাজনৈতিক প্রত্যাশাকে আরও তীব্র করতে পারে। তিনি না ফিরলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে বলেও কেউ কেউ মনে করছেন। বিপরীতে তিনি ফিরলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সরকারের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।

শেখ হাসিনা দেশে ফেরার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—এমন দাবি বিভিন্ন মহলে শোনা গেলেও তাঁর প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ও নির্ভরযোগ্য ঘোষণা ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন। একইভাবে বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ দেশে ফিরবেন কি না, সেটিও এখন অনুমানের বিষয়।

বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ বিভিন্ন দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদ গড়ে তুলেছেন—এমন নানা দাবি রয়েছে। কেউ রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ দীর্ঘমেয়াদি বিদেশবাসের প্রস্তুতি নিয়েছেন বলেও আলোচনা আছে। তবে এসব দাবির সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ভারতে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের মধ্যেও দেশে ফেরার প্রশ্নে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থাকতে পারে। কেউ শেখ হাসিনার সঙ্গে ফিরতে চাইবেন, আবার কেউ তৃতীয় কোনো দেশে যাওয়ার পথ খুঁজতে পারেন—এমন আলোচনা থাকলেও এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে নেই।

‘২০ উড়োজাহাজে ফিরবেন’—কতটা বাস্তব?

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সময় বিদেশে থাকা বিপুলসংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ২০টি উড়োজাহাজে একযোগে দেশে ফিরবেন—এমন কথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। তবে এই দাবির বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

একসঙ্গে ২০টি উড়োজাহাজ চার্টার করে যাত্রী পরিবহনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগাম প্রস্তুতি, বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং বিমানবন্দরের পরিচালনাগত সক্ষমতার বিষয় জড়িত। উড়োজাহাজের ধরন ও যাত্রী ধারণক্ষমতার ওপরও পুরো বিষয়টি নির্ভর করবে। ফলে ‘২০টি বিমানে একসঙ্গে প্রত্যাবর্তন’—এমন দাবিকে আপাতত গুঞ্জন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

বাস্তবে যদি বিদেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের কেউ দেশে ফিরতে চান, তারা বিভিন্ন বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ধাপে ধাপে দেশে ফিরতে পারেন। সুতরাং ২০টি উড়োজাহাজে একযোগে ফেরার গল্পের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল কতটা—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

আসল চ্যালেঞ্জ হতে পারে জনসমাগম

শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু তাঁর নিরাপত্তা কিংবা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়; বরং তাঁকে ঘিরে সম্ভাব্য জনসমাগম কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর দেশে ফেরার ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও ব্যাপক আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। বিপুলসংখ্যক সমর্থক যদি বিমানবন্দর কিংবা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জড়ো হন, তাহলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে বড় ধরনের প্রস্তুতি নিতে হতে পারে।

এখানেই সামনে আসে গ্রেপ্তার ও কারাগারের সক্ষমতার প্রশ্ন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ব্যাপকসংখ্যক গ্রেপ্তার এবং কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দীর বিষয়টি উঠে এসেছে। ফলে কোনো বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক গ্রেপ্তার হলে কারাগারগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে সম্ভাব্য জনসমাগমকে কেন্দ্র করে ‘লাখ লাখ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হবে’—এমন ধারণা বাস্তব ঘটনা হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বরং সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক অধিকার—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।

আওয়ামী লীগের ভেতরেও কি বদলাচ্ছে হিসাব?

২০২৪ সালের আগস্টের পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের নানা নজির দেখা গেছে বলে আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে দলটির নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন, আবার কেউ আন্দোলনের সময় নিজেদের ভূমিকা তুলে ধরেছেন।

তবে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা যত বাড়ছে, তাদের একটি অংশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হতে পারে। বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের চেষ্টা—এসবও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে ব্যক্তিভিত্তিক এমন যোগাযোগের দাবি নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।

সেপ্টেম্বর থেকেই শুরু নতুন রাজনৈতিক হিসাব

সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর—এই সময়টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরবেন কি না, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কী অবস্থান নেবেন এবং সরকার সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করবে—এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।

শেখ হাসিনা ফিরলে সরকারকে একই সঙ্গে আইন, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কঠিন সমীকরণ সামলাতে হবে। আর তিনি না ফিরলে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হবে।

অতএব, সামনে মূল প্রশ্ন একটাই—শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন কি কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ঘটনা হবে, নাকি তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে?

প্রিন্ট করুন