প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩

সাংবাদিকতার আড়ালে চাঁদাবাজির অভিযোগ, অনিবন্ধিত পোর্টাল-পেজের দৌরাত্ম্যে প্রশ্নবিদ্ধ পেশা

মোংলা বন্দরে অনলাইন পোর্টাল ও ফেসবুক পেজের সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে প্রতীকী চিত্র।
ম. ম. রবি ডাকুয়া, বাগেরহাট:

বাগেরহাটের মোংলা বন্দরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ফেসবুক পেজ খুলে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে পেশাদার সাংবাদিকদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে মোংলা বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় অনুমোদন বা নিবন্ধনের বিষয়টি স্পষ্ট নয়—এমন বেশ কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ফেসবুক পেজ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এসব প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট, স্পা সেন্টার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। পরে এসব ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি করার অভিযোগ রয়েছে।

দৈনিক আজকের কথা
সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
— — মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন
সভাপতি, মোংলা বন্দর ব্যবসায়ী সমিতি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দাবিকৃত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে নেতিবাচক বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একাধিক অনলাইন পেজে সংবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। এমনকি ‘অনেকগুলো অনলাইনে নিউজ হয়েছে’—এ ধরনের বক্তব্য দিয়েও ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করা কিংবা প্রকাশিত সংবাদ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এমন কর্মকাণ্ড সত্যতা যাচাই, জনস্বার্থ ও সাংবাদিকতার নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন পেশাদার সাংবাদিকরা।

দৈনিক আজকের কথা
সাংবাদিকতার স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে কেউ চাঁদাবাজিতে জড়ালে তার দায় প্রকৃত সাংবাদিকদের ওপর বর্তায় না। সাংবাদিক পরিচয় ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যাচাই করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে পেশাটির মর্যাদা রক্ষা পাবে।
— মো. জাহিদুল ইসলাম
সভাপতি, মোংলা প্রেসক্লাব।

একাধিক ব্যবসায়ী ও স্থানীয় পেশাজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা সাংবাদিকতা নয়; এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।

একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, সাংবাদিক পরিচয়ে এসে ছবি-ভিডিও ধারণ করে পরে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখানো হলে ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

স্থানীয় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের একজন বলেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সংবাদকর্মীদের দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিও জরুরি। কেউ সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করলে তার দায় প্রকৃত সাংবাদিকদের ওপর চাপানো উচিত নয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধে জড়ালে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনলাইন গণমাধ্যমের পরিচয়, নিবন্ধন, সম্পাদকীয় কাঠামো ও সংবাদকর্মীদের পরিচয় যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এখন যে কেউ স্বল্প খরচে ওয়েবসাইট কিংবা ফেসবুক পেজ খুলে সংবাদ প্রকাশ করতে পারছেন। ফলে প্রকৃত সংবাদমাধ্যম ও ব্যক্তিস্বার্থে পরিচালিত প্ল্যাটফর্মের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণে পাঠক ও সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে।

সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অর্থের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশ বা অপসারণের অভিযোগও তদন্ত করা প্রয়োজন। এতে একদিকে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের হয়রানি কমবে, অন্যদিকে সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থা ও পেশার মর্যাদা আরও সুদৃঢ় হবে।

প্রিন্ট করুন