

‘মাদক ব্যবসায়ী-সেবনকারী-প্রশ্রয়দাতা—কাউকেই ছাড় নয়’: দারোরায় ওসি আনোয়ারের কড়া হুঁশিয়ারি
মাদক ব্যবসা ও সেবনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন কুমিল্লার মুরাদনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেছেন, মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারীদের পাশাপাশি যারা তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় বা সহযোগিতা করবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) বিকেলে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দারোরা ইউনিয়নে আয়োজিত মাদকবিরোধী সমাবেশে প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মুরাদনগর থানা পুলিশের আয়োজনে দারোরা হাই স্কুল মাঠে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে মাদকবিরোধী একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি দারোরা ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে দারোরা হাই স্কুল মাঠে এসে শেষ হয়। এতে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। র্যালিতে মাদকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান ও সচেতনতামূলক বার্তা তুলে ধরা হয়।
সমাবেশে ওসি মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, মাদক একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়, একই সঙ্গে সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। মাদকের বিরুদ্ধে মুরাদনগর থানা পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

মাদক একটি সন্তানকে শুধু নষ্ট করে না—একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়, মা-বাবা ও ভাই-বোনের কাছ থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। মাদকের কড়া গ্রাসে আজ অনেক পাড়া-মহল্লা বিপর্যস্ত। তাই মাদক নির্মূলে পুলিশি অভিযানের পাশাপাশি আমাদের প্রত্যেককে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মাদক নির্মূল শুধু পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। একটি এলাকায় মাদক বিক্রি হচ্ছে কি না, কারা এর সঙ্গে জড়িত, কারা মাদকসেবীদের আশ্রয় দিচ্ছে—এসব বিষয়ে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে মাদকের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এর প্রভাব পুরো পরিবার, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রের ওপর পড়ে। বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজ মাদকের ভয়াবহ ছোবলে আক্রান্ত হলে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
দারোরা দীনেশ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি ও বিশিষ্ট সমাজসেবক সৈয়দ এস এম কায়েস মীর বলেন, মাদকের কারণে বহু পরিবারে অশান্তি নেমে এসেছে। মাদকের ভয়াবহতা শুধু একজন সন্তানকে নয়, মা-বাবা, ভাই-বোনসহ পুরো পরিবারকে একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। পাড়া-মহল্লার সামাজিক পরিবেশও মাদকের কারণে দিন দিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

মুরাদনগরে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান একেবারে জিরো টলারেন্স। মাদক বিক্রি করেন, সেবন করেন কিংবা মাদক ব্যবসায়ীদের প্রশ্রয় দেন—কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। মাদক সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য সরাসরি আমাকে জানাবেন, তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কায়েস মীর আরও বলেন, মাদক নির্মূলকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। শুধু মাদকসেবীকে আটক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; মাদকের উৎস, বিক্রেতা এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধু-বান্ধবের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
তিনি বলেন, মুরাদনগরের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা একটি মাদকমুক্ত ও নিরাপদ সমাজ। মাদক নির্মূল ছিল বর্তমান ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী ও মুরাদনগরের সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা শুধু অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করছে না, তারা পরিকল্পিতভাবে তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে মাদক ব্যবসাকে নিছক অপরাধ হিসেবে না দেখে সামাজিক ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তারা বলেন, কোনো এলাকায় মাদক বিক্রির তথ্য জানা থাকলে ভয় বা সামাজিক সংকোচের কারণে তা গোপন না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। একই সঙ্গে মাদকসেবীদের ঘৃণা না করে তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি। কারণ একজন মাদকসেবীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা মানে একটি পরিবারকে রক্ষা করা।
সমাবেশে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনকে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, তরুণ সমাজ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।
মুরাদনগর থানার এসআই রাজু বড়ুয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও উপজেলা চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আব্দুল আজিজ মোল্লা, দারোরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন খন্দকার, মুরাদনগর থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, দারোরা ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুজিবুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার মোতাহের, গ্রাম্য পশু চিকিৎসক ডা. ওহিদুর রহমান, ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য আলাউদ্দিন, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সদস্য মো. বাবু, গোলাম মোস্তফাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
সমাবেশে বক্তারা প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, দারোরা ইউনিয়নসহ মুরাদনগরের প্রতিটি এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ আরও জোরদার করা হবে। পুলিশের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে মাদক ব্যবসা ও সেবনের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।