প্রিন্ট এর তারিখঃ মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩

দেবীদ্বারে বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বিতরণ, আলোচনা-সমালোচনা

দেবীদ্বারে অসহায়দের মাঝে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বিতরণ করছেন কুমিল্লা জেলা পরিষদ প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়াসহ অতিথিরা।
এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, বিশেষ প্রতিবেদক :

সারাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে সংকট ও লোডশেডিংয়ের অভিযোগের মধ্যেই কুমিল্লার দেবীদ্বারে জেলা পরিষদের অর্থায়নে ২০টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বিতরণ করা হয়েছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ হিসেবে অটোরিকশা বিতরণ করা হলেও চলমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে এগুলোর ব্যাটারি চার্জিং জাতীয় গ্রিডে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে কি না—এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা দেখা দিয়েছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে দেবীদ্বার উপজেলা পরিষদ হলরুমে জেলা পরিষদের অর্থায়নে ২০ জন অসহায় ও কর্মহীন মানুষের মধ্যে এসব অটোরিকশা বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মোস্তাক মিয়া।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, অসহায় ও কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতেই অটোরিকশাগুলো বিতরণ করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে ব্যাটারিচালিত যানবাহন বাড়ানো কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্নও তুলেছেন সচেতন মহলের কেউ কেউ।

বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বিতরণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একদিকে এসব যানবাহন সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। অন্যদিকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জের জন্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সচেতন মহলের মতে, দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি, চার্জিং ব্যবস্থাপনা, যানবাহনের বৈধতা এবং পরিবেশগত প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ঘাটতির সময়ে অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং ব্যবস্থা চালু হলে তা স্থানীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

দৈনিক আজকের কথা
ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা বিতরণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে। উপকারভোগীরা প্যাডেলচালিত অটোরিকশার পরিবর্তে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা নিতে আগ্রহী হওয়ায় তাদের চাহিদা অনুযায়ী এগুলো দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ সংকট সাময়িক, আশা করি দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
— সুফিয়া বেগম
যুগ্ম আহ্বায়ক, কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপি।

তিনি আরও বলেন, অসহায় মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনা করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

এদিকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বিতরণের সময় উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত দেবীদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অশোক বিক্রম চাকমা বলেন, “জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী বিতরণ কার্যক্রমে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আমার জানা নেই।”

দৈনিক আজকের কথা
এটি জেলা পরিষদের নির্ধারিত প্রকল্পের অংশ। প্রকল্পে যেভাবে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল, সেভাবেই বিতরণ করা হয়েছে।
— মো. মোস্তাক মিয়া
প্রশাসক, কুমিল্লা জেলা পরিষদ ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, বিএনপি কুমিল্লা বিভাগ।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেও আয়োজকরা বলছেন, প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে অসহায় মানুষের হাতে কর্মসংস্থানের উপকরণ তুলে দেওয়া। তাদের ভাষ্য, একটি অটোরিকশা একটি পরিবারের নিয়মিত আয়ের পথ তৈরি করতে পারে। ফলে উপকারভোগীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

তবে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি এসব যানবাহনের চার্জিংয়ের জন্য আলাদা ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে কি না। কারণ অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চার্জিংয়ের চাহিদাও বাড়বে। বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর এর প্রভাব কী হবে, সে বিষয়টি প্রকল্প গ্রহণের আগে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না—এ নিয়েও আলোচনা চলছে।

বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে একদিকে নাগরিকদের নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে কর্মসংস্থানের জন্য ব্যাটারিচালিত যানবাহন সম্প্রসারণ—দুটি বিষয়কে সমন্বয়ের মাধ্যমে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, অসহায় মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চার্জিংয়ের কারণে যদি বিদ্যুৎ সরবরাহে আরও চাপ পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই বিতরণের পাশাপাশি চার্জিংয়ের জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে শুধু অটোরিকশাই নয়, উপজেলার জুলাই শহীদ পরিবার, আহত পরিবার এবং বিভিন্ন অসহায়, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের মধ্যেও ৭৫টি সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়। আয়োজকদের আশা, সেলাই মেশিনগুলোও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. গোলাম জাকারিয়া, দেবীদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অশোক বিক্রম চাকমা, কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক রেজভিউল আহসান মুন্সী, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. জসিম উদ্দিনসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

অটোরিকশা বিতরণকে কেন্দ্র করে ওঠা আলোচনা-সমালোচনার মূল জায়গা এখন কর্মসংস্থান ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্য। অসহায় মানুষের হাতে জীবিকার উপকরণ তুলে দেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত চার্জিং ব্যবস্থা, বৈধ যানবাহন পরিচালনা এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে কর্মসংস্থানমূলক এমন উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।

প্রিন্ট করুন