
চেয়ারম্যানের বিস্ফোরক দাবি: ‘২০১৩-১৪ সালের বরাদ্দের প্রকল্পকে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দেখিয়ে রাজনৈতিক ক্ষোভ থেকে অভিযোগ’
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ১৯ নম্বর দারোরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন খন্দকারের বিরুদ্ধে ১৪টি কথিত উন্নয়ন প্রকল্পের নামে প্রায় ২৯ লাখ ১৭ হাজার ৪০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সামনে এসেছে। অভিযোগকারী বিএনপি নেতা ও ইউপি সদস্য রমিজ উদ্দিনের আনা অভিযোগকে ‘কাল্পনিক’, ‘ভিত্তিহীন’ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন চেয়ারম্যান।
সম্প্রতি কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রমিজ উদ্দিন এসব প্রকল্পের অনিয়ম তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। অভিযোগে ২০২৪-২০২৫ ও ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অভিযোগের ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন খন্দকার। তাঁর দাবি, অভিযোগে যেসব প্রকল্পকে ২০২৪-২০২৫ ও ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো আসলে আরও পুরোনো বরাদ্দের আওতাভুক্ত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর কাজ ২০২২-২০২৩ অর্থবছরেই সম্পন্ন হয়েছে এবং বরাদ্দ ছিল ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরের।

আমার বিরুদ্ধে আনা ১৪টি প্রকল্পে প্রায় ২৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন। পুরোনো প্রকল্পকে নতুন অর্থবছরের নামে দেখিয়ে রাজনৈতিক ক্ষোভ থেকে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে। প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ, নথিপত্র ও বাস্তব কাজ যাচাই করলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।
চেয়ারম্যান বলেন, পুরোনো প্রকল্প ও বরাদ্দকে পরবর্তী অর্থবছরের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তৈরি করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধ, ক্ষোভ ও হয়রানির উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে এমন অভিযোগ করা হয়েছে বলেও দাবি তাঁর।
তিনি বলেন, “আমি চাই প্রকল্পগুলোর মূল ফাইল, বরাদ্দের কাগজপত্র, বিল-ভাউচার, প্রকল্প বাস্তবায়নের নথি এবং সরেজমিন কাজ—সবকিছু যাচাই করা হোক। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
অভিযোগকারীর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন চেয়ারম্যানের
চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন খন্দকারের দাবি, জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে অভিযোগকারী নিজেকে ১৯ নম্বর দারোরা ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর মতে, কোনো প্রশাসনিক অভিযোগে অভিযোগকারীর রাজনৈতিক পদ-পদবি উল্লেখ করার বিষয়টি অভিযোগটির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
চেয়ারম্যানের ভাষ্য, অভিযোগে যেসব প্রকল্পের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অর্থবছর, বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে পুরোনো প্রকল্পকে নতুন অর্থবছরের প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করে তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে এসব বক্তব্য চেয়ারম্যানের দাবি হিসেবে উল্লেখযোগ্য; অভিযোগটি নিয়ে প্রশাসনিক তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষের দাবিকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
রমিজের অভিযোগ কী
এর আগে দারোরা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রমিজ উদ্দিন জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া অভিযোগে দাবি করেন, ২০২৪-২০২৫ ও ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ইউনিয়নে ১২টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ২৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়, এসব প্রকল্পের কয়েকটির বাস্তব অস্তিত্ব নেই কিংবা প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি। অভিযোগকারীর দাবি, কাগজপত্রে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে এসব প্রকল্পের বিপরীতে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
অভিযোগে টি-আর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পেও অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। একই স্থানে একাধিকবার প্রকল্প দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া সংরক্ষিত নারী সদস্য আয়েশা বেগম একটি গাইড ওয়াল নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, প্রকল্পটি বাতিল হওয়ার কথা জানানো হলেও পরবর্তীতে ওই প্রকল্পের বরাদ্দের অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি তিনি জানতে পারেন।
প্রশাসনের তদন্তে বের হবে প্রকৃত সত্য
অভিযোগটি পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন। গত ১৫ জুলাই স্থানীয় সরকার শাখার সহকারী কমিশনার আব্দুল্লাহ আল মামুন অভিযোগটি সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।
মুরাদনগরের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাকিব হাছান খান জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়গুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন খন্দকারও তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “অভিযোগ যদি সত্য হয়, তদন্তে তা প্রমাণিত হবে। আর যদি পুরোনো প্রকল্পকে নতুন অর্থবছরের প্রকল্প বানিয়ে অভিযোগ করা হয়ে থাকে, সেটিও তদন্তেই বেরিয়ে আসবে। আমি নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।”
অন্যদিকে অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রকল্পের সরকারি নথি, বরাদ্দপত্র, বিল-ভাউচার এবং সরেজমিন বাস্তবতা যাচাই করলেই অভিযোগের সত্যতা স্পষ্ট হবে।
ফলে ২৯ লাখ টাকার অভিযোগকে ঘিরে চেয়ারম্যানের পাল্টা ‘ষড়যন্ত্রের’ দাবি এবং অভিযোগকারীদের অনিয়মের অভিযোগ—দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যেই এখন প্রশাসনিক তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা। তদন্ত প্রতিবেদনই শেষ পর্যন্ত অভিযোগগুলোর প্রকৃত ভিত্তি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেবে।

