
রূপের সাগর
রূপের মোহে হারিয়ে যাওয়া এক মানুষের প্রতি সতর্ক উচ্চারণ
কবি: আলেয়া মান্নান
রূপের কী যে বাহার তোমার—
যেন রূপের সাগর,
চোখে-মুখে রূপের মেলা,
অঙ্গে রূপের জোয়ার।
রূপ নিয়ে এত অহংকার,
এত কিসের গরব?
রূপের আলো ম্লান হয়ে যায়—
মন যদি হয় পাথর।
রূপনগরে থাকো বুঝি,
রূপই তোমার ধ্যান,
অঙ্গে যেন রূপের বন্যা,
মনে কোথায় প্রাণ?
হাসির আড়াল, মিষ্টি কথায়
জয় করো কত মন,
কিন্তু ভেতর শূন্য হলে
কীসের এত আয়োজন?
অহংকারে মত্ত তুমি,
ভুলে গেছো ভালো-মন্দ,
হাজার মানুষের প্রেমের খেলায়
কখন যে হলে নিঃসঙ্গ!
এখানে-ওখানে ছুটে বেড়াও
প্রেমেরই সন্ধানে,
একদিন দেখবে—আপন মানুষ
নেই আর পাশে টানে।
ও রূপের মানুষ, রূপ ফুটেছে
তোমার অঙ্গে ভরা,
তাই বলে কি প্রেম কুড়াতে
হবে না কোনো সীমানা?
সকাল পেরিয়ে দুপুর আসে,
দুপুর গড়িয়ে রাত,
প্রেমের নামে ছুটে বেড়াও—
কত হৃদয়ে আঘাত!
আকাশ থেকে পাতাল অবধি
খুঁজে ফেরো ভালোবাসা,
কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছো—
কোথায় সত্যিকারের আশা?
নেই কি মনে আল্লাহ-রাসুলের
একটুও কোনো ভয়?
ভেবেছো কি অভিনয় করে
জীবনে মিলবে জয়?
দুনিয়ার চোখ ফাঁকি দিলেও
ফাঁকি কি দেওয়া যায়?
নীরব রাতের গোপন কান্না
কারও কি অগোচর রয়?
হোয়াটসঅ্যাপে মিষ্টি কথা,
ফেসবুকে প্রেমের ছল,
মেসেঞ্জারে আবেগ ঝরে—
বাড়ে হৃদয়ের জল।
টেলিফোনে শুভেচ্ছা পাঠাও,
ইমুতে পাঠাও ছবি,
ইনস্টাগ্রামে ‘হাই-হ্যালো’,
টেলিগ্রামে—‘তোমারই হব আমি’!
কথার জালে, মায়ার ছলে
কত হৃদয় নাও জিতে,
‘ভালোবাসি’ শব্দটি দিয়ে
কত মানুষ যাও রীতিমতো ভেঙে দিতে।
রূপের বাহার তোমার অঙ্গে,
রূপের যেন বন্যা,
কত হৃদয়ে ঢেলেছো তুমি
মিথ্যে প্রেমের ঝর্ণা?
কত চোখে জাগিয়েছো স্বপ্ন,
কত মনে দিয়েছো ঘা,
কত মানুষ তোমার ছলনায়
হারিয়েছে আপন ঠিকানা!
‘ভালোবাসি’ বলার আগে
একবার ভেবো তবে—
ভাঙা হৃদয়ের কান্নাগুলো
কার কাছে গিয়ে রবে?
রূপ তো একদিন ঝরে যাবে,
যৌবন হবে ক্ষয়,
অহংকারের প্রাসাদ ভেঙে
থাকবে শুধু পরিচয়।
যে হৃদয় নিয়ে খেলেছো তুমি,
যে চোখে দিয়েছো জল,
সেই অশ্রুরও হিসাব আছে—
ভুলো না সেই কথা বল।
আজও সময় আছে তোমার,
ফিরে এসো নিজের কাছে,
মিথ্যে প্রেমের পথ ছেড়ে দাও,
সত্যকে রাখো পাশে।
সব মোহ, মায়া, অহংকার ছেড়ে
শুদ্ধ করো চরিত্র,
মানুষের হৃদয় নিয়ে খেলা
নয় জীবনের কৃতিত্ব।
ভাবো—এই পৃথিবী চিরস্থায়ী নয়,
সবাই যাবে একদিন,
রূপ-যৌবন, অর্থ-অহংকার
থাকবে না তো কোনো দিন।
প্রভুর দরবারে যেদিন তুমি
পড়ে যাবে ধরা,
সেদিন বুঝবে—রূপ নয়, মানুষ হওয়াই
জীবনের সবচেয়ে বড় সওগাত সারা।
সেদিন কোনো অভিনয় নয়,
চলবে না কোনো ছল,
নিজের কর্মের আয়নায় তখন
দেখবে নিজেরই মুখখানি অবিকল।
তাই বলি আজ, ও রূপের মানুষ—
থামাও মিথ্যে খেলা,
রূপের অহংকার ভুলে গিয়ে
মানুষ হও, মন মেলা।
কারণ রূপের সাগর শুকিয়ে যায়,
ঝরে যায় ফুলের ঘ্রাণ—
কিন্তু ভালো মানুষের ভালোবাসা
বেঁচে থাকে যুগের পর যুগ, অম্লান।
কবি পরিচিতি
আলেয়া মান্নান নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম ইমাম হোসাইন এবং মাতা মোসা. জুবাইদা খাতুন।
তিনি একাধারে একজন সংসারী, কর্মজীবী ও জীবনসংগ্রামী মা। ভ্রমণপিপাসু ও দুরন্ত শৈশবের স্মৃতিবাহী কবি সহজ-সরল জীবনযাপন পছন্দ করেন। বিপদে-আপদে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাঁর জীবনদর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

রূপ-সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু মানুষের চরিত্র ও কর্মই তার প্রকৃত পরিচয়। রূপের অহংকারে অন্যের হৃদয় নিয়ে খেলা, মিথ্যা ভালোবাসার অভিনয় কিংবা সম্পর্ককে বিনোদনে পরিণত করার পরিণতি একদিন না একদিন মানুষকে বুঝতেই হয়। তাই সময় থাকতে অহংকার, প্রতারণা ও মিথ্যা প্রেমের পথ ছেড়ে নিজেকে সংশোধন করা উচিত।
সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তাঁর কবিতার পথচলা। ইতোমধ্যে তাঁর লেখা ৩৫টিরও বেশি কবিতা বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখায় ব্যক্তি-জীবনের অভিজ্ঞতা, মানবিক সম্পর্ক, সামাজিক বাস্তবতা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং আত্মশুদ্ধির আহ্বান বিভিন্নভাবে উঠে আসে।

